দিনে আয় ৪০০ টাকা, তিন প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে অসহায় বাবা
দিনে আয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে এই সামান্য আয়ে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। এর মধ্যেই তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বাবা স্বাধীন সূত্রধরের। সংসারের অভাবের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছেন সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের এই বাসিন্দা।স্বাধীন সূত্রধরের তিন সন্তান সনজীব সূত্রধর (১৮), সৃষ্টি সূত্রধর (১৫) ও সমাপ্ত সূত্রধর (১২)। তিনজনই প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বাধীন। সন্তানদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হয় মা শ্রীমতী সূত্রধরকে। ফলে তাঁর পক্ষে বাইরে গিয়ে আয় করা সম্ভব হচ্ছে না।সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি। এর মধ্যে দুই সন্তান প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সৃষ্টি এখনো ভাতা পাচ্ছে না।দিনে ৪০০ টাকায় চলে সংসারস্বাধীন সূত্রধর বলেন, “আমি মানুষের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই। সেই টাকায় টেনেটুনে আমার সংসার চালাতে হয়। আমার বড় ছেলের বয়স এখন ১৮। বড় ছেলেটা সুস্থ থাকলে আমার সংসারের হাল ধরত। আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে আমার স্ত্রী। এদের রেখে আমার স্ত্রী কোনো কাজ করতে পারে না।”তিনি আরও জানান, বড় ছেলে ও ছোট মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও মেজো মেয়ে সৃষ্টি এখনো ভাতা পায়নি। গত এক বছর ধরে শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ভাতার জন্য আবেদন করছেন তাঁরা।স্বাধীন সূত্রধরের ভাষ্য, কেন সৃষ্টির ভাতা চালু হয়নি, তা তাঁরা জানেন না। পরিবারের সদস্যদের সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।সন্তানদের দেখাশোনায় কাটে মায়ের সারাদিনতিন সন্তানকে আগলে রাখাই শ্রীমতী সূত্রধরের প্রতিদিনের কাজ। সন্তানদের পরিচর্যার কারণে সংসারের জন্য বাড়তি আয় করার সুযোগ নেই তাঁর।শ্রীমতী সূত্রধর বলেন, “আমার সারাদিন যায় এদের দেখাশোনায়। এদের রেখে বাইরে গিয়ে সংসারের জন্য কোনো কাজ করতে পারি না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া—তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দিলে আমরা হয়তো বাঁচতে পারব।”পরিবারটির প্রতিবেশী রঞ্জন সূত্রধরও তাঁদের আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, স্বাধীন সারাদিন অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন, আর তাঁর স্ত্রী তিন সন্তানকে দেখাশোনা করেন। পরিবারটির চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।এক মেয়ের ভাতা চালু হয়নি এক বছরেওস্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য সুনীল চন্দ্র দাস জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সমাজসেবা কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবারের দুই সন্তানকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনতে সহযোগিতা করেছেন। সৃষ্টির জন্যও আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো ভাতা চালু হয়নি।পরিবারটি যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়, সে জন্য নিজের সাধ্যমতো সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান তিনি।শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বপতি চক্রবর্তী বলেন, “এই পরিবারটির বিষয়ে আমি অবগত আছি। দুই সন্তানের প্রতিবন্ধী ভাতা হয়েছে। আরেকজনের বিকাশ পেমেন্ট নম্বরটি দিলে ডিসেম্বরের মধ্যে ভাতা পাবে।”তিনি আরও জানান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে দেওয়া হয়। পরিবারটিকে সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।তিন সন্তানকে হুইলচেয়ার দেওয়ার আশ্বাসশাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে ভাতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তারপরও পরিবারটির জন্য কিছু করা যায় কি না, তা দেখবেন বলে জানান তিনি।এদিকে সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বলেন, তিনি পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। বিকাশ পেমেন্ট নম্বর দেওয়া হলে সৃষ্টির ভাতা দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি আপাতত পরিবারটিকে তিনটি হুইলচেয়ার দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।তিনি আরও জানান, পরবর্তী সময়ে সন্তানদের চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।আশ্বাসের বাস্তবায়ন চান পরিবারটিদিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা স্বাধীন সূত্রধরের একার পক্ষে বড় চ্যালেঞ্জ।জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আশ্বাস পরিবারটির মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে সৃষ্টির প্রতিবন্ধী ভাতা চালু এবং তিনটি হুইলচেয়ার হস্তান্তরের উদ্যোগ কবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।পরিবারটির প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তাও দ্রুত তাঁদের কাছে পৌঁছাবে। এতে তিন সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।