সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
চেকপোস্ট

১২ বছর পর শিশু পরিবারেই শারমিনের বিয়ের আয়োজন

একদিন পথ হারিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে সুনামগঞ্জের ছাতকে চলে এসেছিল ছোট্ট শারমিন আক্তার। জানা ছিল না নিজের ঠিকানা, খুঁজে পাচ্ছিল না আপনজনদের। অনিশ্চয়তার সেই সময়ে আশ্রয় মেলে সরকারি শিশু পরিবারে। সেখানেই কেটে যায় তাঁর শৈশব ও কৈশোরের প্রায় ১২টি বছর। সেই প্রতিষ্ঠানেই এবার নতুন জীবনের পথে পা রাখলেন শারমিন। ধুমধাম করে তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হয় সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের আঙিনায়।শারমিনের বিয়েকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শিশু পরিবার। অনুষ্ঠানে অংশ নেন জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন, শিশু পরিবারের বর্তমান বাসিন্দা ও সাবেক সদস্যরা। সবার দোয়া, শুভকামনা ও ভালোবাসায় নবদম্পতির নতুন জীবনের সূচনা হয়।পথ হারিয়ে ছাতকে, তারপর শিশু পরিবারে আশ্রয়শারমিনের জন্ম ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। তাঁর বাবা জাকির মিয়া এবং মা হাছিনা বেগম। প্রায় ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালে, ছাতক থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে তাঁর বাবা-মায়ের নাম জানতে পারে সরকারি শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষ।এর আগে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে পথ হারিয়ে ছাতকে চলে এসেছিল শিশুটি। ছাতক থানা পুলিশ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রথমে সিলেটের একটি সেইফ হোমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাঁকে শিশু পরিবারে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।তবে সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে আসন খালি না থাকায় ২০১৫ সালের ১৬ মার্চ তাঁকে শ্রীমঙ্গল সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় দুই বছর থাকার পর আসন খালি হলে শারমিনকে সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে নিয়ে আসা হয়।এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানেই কাটে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। শিশু পরিবারের পাশের বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। একসময় যে প্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর আপন ঠিকানা।নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী, নতুন সংসারের স্বপ্নবর্তমানে ১৯ বছর বয়সী শারমিন নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পশ্চিম নিয়ামতপুর গ্রামের ইয়াকুব আলী ও নাছিমা আক্তারের ছেলে মুজাহিদুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থেকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২১ বছর বয়সী মুজাহিদুল সুনামগঞ্জ শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করেন। সেই সম্পর্কের পরিণতিতেই তাঁদের বিয়ের আয়োজন করা হয়।বিয়েকে ঘিরে শিশু পরিবারের বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। যেন পরিবারেরই একজন মেয়ের বিয়ে। প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা ৫৭ জন শিশু-কিশোরীর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে যোগ দেন সাবেক বাসিন্দারাও। তাঁদের অনেকে বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠানটির বাইরে রয়েছেন। পুরোনো স্মৃতি ও পারস্পরিক ভালোবাসার টানে তাঁদের উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের ইতিহাসে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন এবারই প্রথম বলে জানা গেছে। ফলে শারমিনের বিয়ে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায় নয়, প্রতিষ্ঠানটির জন্যও একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে উঠেছে।জেলা প্রশাসকের আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশজেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, সরকারি শিশু পরিবার, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা কার্যালয় এবং সংসদ সদস্যের সমন্বিত প্রচেষ্টায় শারমিন ও মুজাহিদুল ইসলামের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ায় তিনি আনন্দিত, গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছেন।নবদম্পতির জন্য দোয়া করে তিনি বলেন, তাঁরা যেন সুখ ও শান্তিতে দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারেন। পাশাপাশি বিয়ের আয়োজন সফল করতে যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।আশ্রয় থেকে নতুন জীবনের পথেএকদিন যে মেয়েটি পথ হারিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছাতকে এসেছিল, আজ সেই মেয়েটিই শুরু করলেন নতুন জীবন। পেছনে রয়ে গেল সরকারি শিশু পরিবারের স্নেহ-মমতায় ঘেরা শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি। সামনে নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব আর নতুন স্বপ্ন।শারমিনের এই বিয়ে আবারও মনে করিয়ে দেয়, আপন হয়ে ওঠার জন্য শুধু রক্তের সম্পর্কই যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা, মমতা ও সহযোগিতার বন্ধনেও গড়ে উঠতে পারে একটি পরিবার। সেই পরিবারের ছায়াই একদিন আশ্রয় পাওয়া একটি মেয়ের জীবনে খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

১২ বছর পর শিশু পরিবারেই শারমিনের বিয়ের আয়োজন