রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
চেকপোস্ট

বিশ্বে প্রতি ৫ প্লেটের ১ প্লেট খাবার অপচয়, ক্ষুধার্ত ৬৪ কোটি মানুষ

বিশ্বজুড়ে পরিবেশন করা প্রতি পাঁচ প্লেট খাবারের প্রায় এক প্লেট শেষ পর্যন্ত অপচয় হয়। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ কোটি টনেরও বেশি। অথচ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলেন। অর্থাৎ, বিশ্বে প্রতি ১৩ জনে একজন পর্যাপ্ত খাবার পাননি।শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবসে খাদ্যের অপচয় ও ক্ষুধার এই বৈপরীত্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৯৪৫ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। দিনটিকে স্মরণ করে প্রতিবছর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। চলতি বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।বিশ্বে ক্ষুধার হার কমলেও উদ্বেগ কাটেনিজাতিসংঘের বার্ষিক ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে টানা তৃতীয় বছরের মতো ক্ষুধার হার কমেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিলেন।২০২৪ সালে এই হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে ২০১৯ সালের তুলনায় এখনও প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছেন। ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মহামারিপূর্ব অবস্থায় ফিরতে পারেনি বিশ্ব।আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশিবিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় আফ্রিকায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে মহাদেশটিতে আনুমানিক ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছেন। অর্থাৎ, আফ্রিকার প্রতি পাঁচজনের একজন অপুষ্টির শিকার। বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই এই মহাদেশে বসবাস করেন।অন্যদিকে, এশিয়ায় প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ বা মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগেছেন। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ, যা ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকেও দেশভিত্তিক পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এই সূচকে অপুষ্টি, শিশুদের খর্বতা, কৃশতা ও শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনা করে দেশগুলোকে ১০০-এর মধ্যে স্কোর দেওয়া হয়। ৩৫ বা তার বেশি স্কোরকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।সূচক অনুযায়ী, আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এর মধ্যে সাতটি দেশ আফ্রিকায় অবস্থিত। অন্তর্ভুক্ত ১২২টি দেশের মধ্যে সোমালিয়ার পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এরপর রয়েছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মাদাগাস্কার। সুদান, দক্ষিণ সুদান, বুরুন্ডি ও ইয়েমেনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে বিবেচিত হয়েছে। তবে সংঘাত ও তথ্যের ঘাটতির কারণে এসব দেশের স্কোর নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ খাদ্যখামার থেকে খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয়। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের প্রায় ১৩ শতাংশ ফসল তোলার পর থেকে খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এই ক্ষতি হয়। ফলমূল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি।এফএওর হিসাব অনুযায়ী, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই প্রতিবছর যে খাদ্য নষ্ট হয়, তার আর্থিক মূল্য ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।অন্যদিকে, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) জানিয়েছে, দোকান, রেস্তোরাঁ ও পরিবারে ভোক্তাদের জন্য সহজলভ্য খাদ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফেলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালে এই অপচয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০৫ কোটি টন। ২০ টন ধারণক্ষমতার প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাকের সমান এই খাদ্য।খাদ্য অপচয়ের ৬০ শতাংশই পরিবারেইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশের জন্য দায়ী পরিবারগুলো। মোট অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটে বাড়িতে। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অপচয় হয় ২৮ শতাংশ এবং দোকানে ১২ শতাংশ।বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে বছরে প্রায় ১৩২ কেজি খাবার অপচয় করেন। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ কেজি খাবার নষ্ট হয় বাড়িতে। দেশভেদে এই পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।কোন দেশে খাবার অপচয় বেশি?ইউএনইপির মতে, উষ্ণ জলবায়ুর দেশগুলোতে বাড়িতে খাদ্য অপচয়ের হার বেশি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাজা ফলমূল ও শাকসবজির বেশি ব্যবহার এবং হিমায়ন বা রেফ্রিজারেশনের সীমিত সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়।জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মালদ্বীপে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার ফেলে দেন, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এরপর রয়েছে সিরিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, সেশেলস, মেক্সিকো ও তিউনিসিয়া। এসব দেশে মাথাপিছু বছরে ২১০ কেজির বেশি খাবার অপচয় হয়।অন্যদিকে, স্পেনে মাথাপিছু বছরে প্রায় ৩৯ কেজি বা তার কম খাবার অপচয় হয়, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর অন্যতম।বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রেক্ষাপটে এসব পরিসংখ্যান খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। একদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে। তাই খাদ্যের অপচয় কমানো, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা এবং সবার জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বে প্রতি ৫ প্লেটের ১ প্লেট খাবার অপচয়, ক্ষুধার্ত ৬৪ কোটি মানুষ