তীব্র মাথাব্যথা, আলো ও শব্দে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব কিংবা মাথা ঘোরা—মাইগ্রেনের এসব উপসর্গ অনেকের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে। তবে পুরুষের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।মাইগ্রেন শুধু সাধারণ মাথাব্যথা নয়। এটি একটি জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্ক বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।মাইগ্রেনে মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি, মাথা ঘোরা, আলো ও শব্দে অস্বস্তি এবং সাময়িকভাবে চিন্তা বা মনোযোগে সমস্যা হতে পারে। সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না।কারও ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আগে অতিরিক্ত ক্লান্তি, হাই তোলা বা ঘাড়ে ব্যথার মতো পূর্বাভাস দেখা দিতে পারে। আবার কারও চোখের সামনে ঝলকানি, জিগজ্যাগ রেখা বা সাদা দাগের মতো দৃশ্যগত পরিবর্তনও হতে পারে, যাকে অরা বলা হয়।মাথাব্যথার পরেও অনেকের ক্লান্তি বা মনোযোগের সমস্যা এক-দুই দিন থাকতে পারে।মাইগ্রেনের পেছনে সাধারণত একটি মাত্র কারণ থাকে না। বিভিন্ন ছোট ছোট পরিবর্তন একসঙ্গে মিলে মস্তিষ্কের সহনসীমা অতিক্রম করলে আক্রমণ শুরু হতে পারে।সম্ভাব্য উদ্দীপকের মধ্যে রয়েছে হরমোনের পরিবর্তন কম বা অনিয়মিত ঘুম দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা রক্তে শর্করার ওঠানামা পানিশূন্যতা মানসিক চাপ আবহাওয়ার পরিবর্তন অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গেও মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই ঘন ঘন মাইগ্রেন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।নারীদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বয়ঃসন্ধিতে মেয়েদের মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়তে পারে, বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার পর।মাসিকের ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ায় এ সময় মাইগ্রেনের আক্রমণ তুলনামূলক বেশি তীব্র হতে পারে।এ ছাড়া পেরিমেনোপজের সময় হরমোনের দ্রুত ওঠানামার কারণেও অনেক নারীর মাইগ্রেন বেড়ে যেতে পারে। ঘুমের সমস্যা ও পারিবারিক নানা দায়িত্বও এ সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।মেনোপজের পর হরমোনের মাত্রা স্থিতিশীল হলে কিছু নারীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের সংখ্যা ও তীব্রতা কমে আসতে পারে।মাইগ্রেনের সম্ভাব্য উদ্দীপক শনাক্ত করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য মাথাব্যথা শুরু হওয়ার আগের কয়েক দিনের ঘুম, খাবার, পানি পান, মানসিক চাপ ও অন্যান্য পরিবর্তন লিখে রাখা যেতে পারে।এ ছাড়া নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন পর্যাপ্ত পানি পান করুন প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস করুন নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করুন অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন সম্ভাব্য উদ্দীপক শনাক্ত করে তা এড়িয়ে চলুন ছুটির দিনেও ঘুম ও খাবারের রুটিনে বড় পরিবর্তন না আনার পরামর্শ দেওয়া হয়।মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। ব্যথানাশক ও বমি প্রতিরোধক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ট্রিপটান-জাতীয় ওষুধও চিকিৎসকরা দিতে পারেন।তবে কোন ওষুধ কার জন্য নিরাপদ, তা ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও অন্যান্য ওষুধের ওপর নির্ভর করে। তাই নিয়মিত বা ঘন ঘন মাইগ্রেন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করাই ভালো।ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন বি২-এর মতো কিছু সাপ্লিমেন্টও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণের সংখ্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।মাসিকের সঙ্গে সম্পর্কিত মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে কিছু নারীর জন্য হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা বিবেচনা করা হয়। তবে এ ধরনের চিকিৎসাও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিতে হয়।মাইগ্রেন দীর্ঘস্থায়ী হলেও বিভিন্ন চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কারও ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি কার্যকর, অন্যের ক্ষেত্রে তা একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। তাই বারবার তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টির পরিবর্তন, বমি বা অন্যান্য উপসর্গ হলে কারণ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।