শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
চেকপোস্ট

সৈয়দপুরে উদ্যোক্তা সাজুর কারখানায় তৈরি ঝাড়ু বিদেশে রপ্তানির প্রত্যাশা, ভবঘুরেদের কর্মসংস্থান

নীলফামারীর সৈয়দপুরে তৈরি হচ্ছে গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ ফুলের ঝাড়ু। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব ঝাড়ু সরবরাহ করা হচ্ছে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এবার সৌদি আরবসহ বিদেশের বাজারে ঝাড়ু রপ্তানির প্রত্যাশা করছেন উদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু। তাঁর এই উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন কয়েকজন দরিদ্র, বেকার ও ছিন্নমূল মানুষ। এতে তাঁদের জীবনে ফিরছে স্বচ্ছলতার আশা।শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে সৈয়দপুর শহরের সাহেবপাড়ায় রেলওয়ে হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত রেলওয়ে কোয়ার্টারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক ব্যস্ত সময় পার করছেন ঝাড়ু তৈরির কাজে। কেউ ফুল গুছিয়ে মুঠো করে বাঁধছেন, কেউ পাটকাঠি লাগাচ্ছেন, আবার কেউ পাটকাঠির তৈরি রোল কেটে সমান করছেন। অন্যরা ঝাড়ুর হাতলে কালো টেপ পেঁচিয়ে দিচ্ছেন। কয়েক ধাপে শ্রমিকদের হাত ঘুরে তৈরি হচ্ছে ব্যবহার উপযোগী ঝাড়ু।দিনে তৈরি হচ্ছে ৭০০ থেকে ১ হাজার ঝাড়ুকারখানাটির নাম ‘আরব ট্রেডার্স অ্যান্ড কুটির শিল্প’। এখানকার উৎপাদিত পণ্যের নাম ‘গ্রাম বাংলা ঝাড়ু’। প্রতিষ্ঠানটি ‘আর এস এন্টারপ্রাইজ’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ঝুট কাপড় থেকে পোশাক তৈরিকারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্প মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ফাইয়াজুল হক সাজু এ উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন।কারখানাটিতে প্রতিদিন বিভিন্ন আকার ও মডেলের প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার পিস ঝাড়ু তৈরি হচ্ছে। এতে ৭ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত ঝাড়ু সৈয়দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে।উদ্যোক্তার প্রত্যাশা, স্থানীয় বাজারে চাহিদা ধরে রাখার পাশাপাশি শিগগিরই এসব ঝাড়ু বিদেশের বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের নতুন কর্মসংস্থানকারখানার প্রধান কারিগর হিসেবে কাজ করছেন সৈয়দপুর শহরের বাঙালিপুর নিজপাড়া এলাকার মো. লিটন সরকার (৫৫)। তাঁর দুই ছেলে মো. পারভেজ (২৮) ও মনিরুল ইসলাম (১৮) ঝাড়ুর হাতলে পাটকাঠি লাগানো ও তার দিয়ে বাঁধার কাজ করেন।এ ছাড়া ছিন্নমূল নারী পুতুল (৩৮) পাটকাঠি থেকে ময়লা পরিষ্কারের কাজ করেন। আরও চারজন দরিদ্র যুবক তার ও টেপ পেঁচিয়ে ঝাড়ু তৈরির কাজ সম্পন্ন করেন।সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালিপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর পীরপাড়া এলাকার নুর ইসলামের ছেলে নুরনবী (১৫) জানায়, আগে সে বেকার অবস্থায় ঘুরে বেড়াত। এখন এই কারখানায় কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছে।নুরনবী বলে, সাজু স্যার ধরে এনে ভালো কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর জন্য এখন বাবা-মায়ের সঙ্গে সংসারের হাল ধরতে পারছি। এখন আর না খেয়ে থাকতে হয় না।কারখানার কর্মী পুতুলও তাঁর জীবনের পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। কখনো খাবার জুটত, কখনো না খেয়েই দিন কাটত। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অন্য কাজ পাওয়াও কঠিন ছিল। এখন ঝাড়ু তৈরির কাজ করে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করতে পারছেন।তাঁর ভাষায়, এভাবে কাজ করে যে টাকা পাব, কখনোই ভাবতে পারিনি। এখন আরামের কাজ পেয়েছি। এজন্য সাজু স্যারকে অনেক দোয়া করি।কম দামে ঝাড়ু, লাভবান হচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতাউদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু বলেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস কারখানা থেকে ফেলে দেওয়া ঝুট কাপড় সংগ্রহ করে সৈয়দপুরে পাঁচ শতাধিক ক্ষুদ্র গার্মেন্টস শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি পোশাক, ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে।তিনি বলেন, নতুন নতুন ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই কুমিল্লায় ঝাড়ু তৈরির কারখানা দেখে এবং কাজ শিখে সৈয়দপুরে এ কার্যক্রম শুরু করেছেন। সুদূর রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে ঝাড়ু তৈরির ফুল সংগ্রহ করে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়ে উৎপাদন করা হচ্ছে।সাজুর মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মহীন তরুণদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পাটচাষিদের ফেলে দেওয়া পাটকাঠি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে কম দামে ঝাড়ু উৎপাদন ও বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে।তিনি জানান, আগে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম থেকে তৈরি ঝাড়ু এনে আকারভেদে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করা হতো। বর্তমানে তাঁদের কারখানায় তৈরি ঝাড়ু ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য পাচ্ছেন, পাশাপাশি বিক্রেতাদেরও লাভের সুযোগ বাড়ছে।সৌদি আরবসহ বিদেশে রপ্তানির প্রত্যাশাউদ্যোক্তা ফাইয়াজুল হক সাজু বলেন, সৈয়দপুরসহ রংপুর বিভাগের সব জেলায় তাঁদের তৈরি ঝাড়ু বিক্রি হচ্ছে। এবার সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানির প্রস্তুতি নেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে তাঁর।তিনি আরও বলেন, আমরা নতুন নতুন পণ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীদের সহযোগিতা করে উদ্যোক্তা তৈরির চেষ্টা করছি। তাঁদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টিতেও কাজ করছি।সাজুর মতে, ঝাড়ু এমন একটি পণ্য, যার সারা বছরই চাহিদা রয়েছে এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। তাই এ শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।সৈয়দপুরের ব্যবসায়ী ও আগ্রহী তরুণদের এ ধরনের ক্ষুদ্র হস্তশিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, স্থানীয় উদ্যোগ ও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় বাড়বে এবং ভবিষ্যতে দেশের বাইরে নতুন বাজার তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।

সৈয়দপুরে উদ্যোক্তা সাজুর কারখানায় তৈরি ঝাড়ু বিদেশে রপ্তানির প্রত্যাশা, ভবঘুরেদের কর্মসংস্থান