আ.লীগ নেতাদের পুরোনো সিগারেট কারখানায় এনসিপি নেতা পাটওয়ারীর সফর
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ‘জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেড’ নামে একটি সিগারেট কারখানা পরিদর্শন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার এই ‘ব্যক্তিগত সফর’ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারখানাটির আগের মালিকানা, বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।সোমবার (৫ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কুষ্টিয়া সফরের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাকে একটি কারখানার ভেতরে কয়েকজনের সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়। তার সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম জিয়া উদ্দিন রনিসহ কয়েকজনকে দেখা যায়।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওতে দেখা কারখানাটি ‘জেনুইন লিফ টোব্যাকো লিমিটেড’। স্থানীয়দের দাবি, একই স্থানে আগে ‘তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতো। ওই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) তদন্ত করছে।কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার দাবি করেন, জেনুইন লিফ টোব্যাকো সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও সাবেক কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের প্রতিষ্ঠান।অন্যদিকে, এ কে এম জিয়া উদ্দিন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, জেনুইন লিফ টোব্যাকো পুরোপুরি তার মালিকানাধীন এবং নওফেল বা আবদুস সবুর লিটনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো সম্পর্ক নেই।নিজের দাবির পক্ষে তিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ৩ নম্বর বাহিরচর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যু করা একটি ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য দেন। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ওই লাইসেন্সে মালিক বা প্রতিনিধি হিসেবে এম. কে. এম জিয়া উদ্দিনের নাম উল্লেখ রয়েছে।লাইসেন্স অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার বাহিরচরের দশ মাইল এলাকায়। ব্যবসার ধরন হিসেবে তামাকপণ্য আমদানি, রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা উল্লেখ রয়েছে। লাইসেন্সটির মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত।কারখানাটি আগের ‘তারা টোব্যাকো’ কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জিয়া উদ্দিন দাবি করেন, বিষয়টি সঠিক নয়। তিনি জানান, তিনি মো. জাকির হোসেনের কাছ থেকে জায়গা ও কারখানার শেড ভাড়া নিয়েছেন।এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ মো. জাকির হোসেন ও জেনুইন লিফ টোব্যাকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম জিয়া উদ্দিনের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তিতে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৩ বর্গফুট জায়গা ও তিনটি ফ্যাক্টরি শেড ১০ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।চুক্তিতে জামানত হিসেবে ৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ওই অর্থ পরবর্তী ২০ মাসে প্রতি মাসে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩ টাকা করে ভাড়ার সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।জিয়া উদ্দিন আরও দাবি করেন, তিনি আগে ‘তারা টোব্যাকো’র ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) হিসেবে কাজ করতেন। এ কারণে তাকে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নানা অভিযোগ করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কারখানা সফরটি দলীয় কর্মসূচি ছিল না বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া এনসিপির নেতারা।জেলা এনসিপির সদস্যসচিব সুলতান মারুফ তালহা বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সফরটি ব্যক্তিগত ছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় নেতারা আগে থেকে কিছু জানতেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়া উদ্দিন রনি প্রতিষ্ঠানটির একজন মালিক।জেলা এনসিপির আহ্বায়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনিও জানান, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাকে ফোনে জানিয়েছিলেন যে তিনি ব্যক্তিগত কাজে ভেড়ামারায় এসেছেন। পরে কুষ্টিয়ায় দেখা করার কথা হয়।গণধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলের স্থানীয় নেতাদের না জানিয়ে ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।এদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর কুষ্টিয়া সফরের আগের দিন, ৪ অক্টোবর, কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের মাজার প্রাঙ্গণে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
কারখানা সফর ও এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।