লবণ আমদানিতে বাজারে স্বস্তি টিকে থাকা কঠিন খুলনার মিলের
দেশে সম্ভাব্য লবণ সংকট ও দাম বাড়ার আশঙ্কা মোকাবিলায় সরকার দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হলেও খুলনার লবণশিল্পে সংকট কাটছে না।উচ্চ আমদানি শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের মান ও পরিবহন ব্যয়ে বৈষম্য এবং গ্যাস-সুবিধার অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে খুলনার লবণ মিলগুলো। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চালু থাকা মিলগুলোও টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়েছে।পদ্মা সল্ট ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শ্রমিক হায়দার আলী বলেন, একসময় খুলনায় ২৯টি লবণ মিল থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৯টি। অধিকাংশ মিলের অবস্থাও ভালো নয়। কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাজারে চাহিদা কম থাকায় নিয়মিত উৎপাদন করা যাচ্ছে না।তিনি জানান, খুলনার মিলগুলো মূলত কুতুবদিয়া থেকে কাঁচা লবণ সংগ্রহ করে। এ লবণে গ্লেজ কম থাকায় ভালোভাবে ধুয়ে ও পরিশোধন করে সাদা করতে হয়। অন্যদিকে মহেশখালীর বোল্ডার লবণ তুলনামূলক সাদা ও গ্লেজযুক্ত হওয়ায় কম প্রক্রিয়াজাত করেই ব্যবহার করা যায়। এর সঙ্গে খুলনায় গ্যাস-সুবিধা না থাকায় উৎপাদন ব্যয়ও বেশি।রূপসার শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের মালিক নুরুল হুদা বলেন, প্যাকেটজাত ভ্যাকুয়াম সল্টের বাজারে দেশি পণ্যের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে মাসে প্রায় দেড় লাখ কার্টন বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৩ হাজার কার্টনে। ক্রেতাদের বড় অংশ সাদা ও ঝরঝরে ভ্যাকুয়াম সল্টের দিকে ঝুঁকছেন।রমনা সল্ট রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, আমদানি করা লবণের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজভাড়াও বেড়েছে।তার ভাষ্য, দেশে মজুত থাকা লবণ পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত নাও চলতে পারে। এতে মৌসুম শুরুর আগে বাজারে সংকট তৈরি হয়ে দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ায় বাজারের ঝুঁকি কমবে। তবে আমদানি শুল্ক কমানো হলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।খুলনায় গ্যাস-সুবিধার অভাবকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ সেলিম। তার মতে, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মিলগুলো গ্যাস-সুবিধা পাওয়ায় তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন করতে পারে। এতে খুলনার মিলগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।মধুমতি সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ওমর খালেদও মনে করেন, লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে আমদানি শুল্ক কমানো হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা আরও সহজ হবে।তিতাস সল্টের কর্মকর্তা রঞ্জন হালদার বলেন, খুলনায় উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ কাঁচামালের মান। কুতুবদিয়া থেকে আসা কাঁচা লবণে ঘাটতি থাকায় ভালো মানের লবণ তৈরি করতে কয়েক ধাপে পরিশোধন করতে হয়। পাশাপাশি কাঁচামাল পরিবহনেও খুলনার মিলগুলোকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়।তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মিলগুলো তুলনামূলক কম পরিবহন খরচে কাঁচামাল পায়। ফলে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় খুলনার কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৯৮৩ সালে খুলনায় লবণশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ভৈরব ও রূপসা নদীর তীরে একসময় ২৮টির বেশি লবণ মিল গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন কারণে ১৯৯৮ সাল থেকে অনেক মিল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বিসিকের হিসাবে জেলায় ৯টি লবণ কারখানা চালু রয়েছে।মিল মালিকদের মতে, বন্যা, লোকসান, পুঁজি সংকট, ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বড় মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।বিসিক খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম সাকলাইন বলেন, সরকার লবণ আমদানির যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে খুলনার লবণশিল্পের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ এখানে মূলত লবণের কাঁচামাল আমদানি করা হবে।তিনি জানান, খুলনায় বর্তমানে কোনো লবণচাষি নেই এবং নয়টি লবণ কারখানা চালু রয়েছে। কারখানার মালিকেরা ভবিষ্যতে আরও কাঁচামাল আমদানিতে আগ্রহী। আমদানির মাধ্যমে কাঁচামালের সংকট কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।