ঔষধি উদ্ভিদে নিরাপদ ব্রয়লার মাংস, বাকৃবির নতুন প্রযুক্তি
ঔষধি উদ্ভিদ প্ল্যানটেইন ব্যবহার করে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ব্রয়লার মাংস উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। প্রায় ২০ বছরের ধারাবাহিক গবেষণার ভিত্তিতে প্ল্যানটেইনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ঔষধি বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে তারা তৈরি করেছেন ‘বাউ-প্ল্যানটিফ’ নামে একটি ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভ।গবেষকদের দাবি, ব্রয়লার ও দেশি মুরগির ওপর ধারাবাহিক পরীক্ষায় ‘বাউ-প্ল্যানটিফ’-এর ইতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। প্রচলিত কৃত্রিম অ্যাডিটিভের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাকৃবির অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন। সহযোগী গবেষক হিসেবে রয়েছেন উদ্ভিদতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. তামান্না হক। স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (বিএএস)-ইউএসডিএ অর্থায়নে পরিচালিত ‘সাসটেইনেবল কমার্শিয়ালাইজেশন অব প্ল্যানটেইন অ্যান্ড সিড ভ্যালু চেইন ডেভেলপমেন্ট ফর সেফ অ্যান্ড ফাংশনাল ব্রয়লার মিট প্রোডাকশন’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যানটেইনকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে দেশীয় কয়েকটি ঔষধি উদ্ভিদের সমন্বয়ে ‘বাউ-প্ল্যানটিফ’ তৈরি করা হয়েছে। প্রচলিত মেডিসিন ব্যবহারে প্রতি মুরগিতে গড়ে প্রায় সাড়ে ৮ টাকা খরচ হলেও এই ফিড অ্যাডিটিভ ব্যবহারে তা প্রায় ৭ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।ড. আল-মামুনের ভাষ্য, ২০০৪ সালে জাপানে পিএইচডি করার সময় থেকেই তিনি প্ল্যানটেইন নিয়ে গবেষণা করছেন। পরে বাংলাদেশে এর চাষ, ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চালানো হয়। বর্তমানে ‘বাউ-প্ল্যানটিফ’ গবেষণাগার থেকে খামার পর্যায়ে প্রয়োগের পর্যায়ে এসেছে।গবেষকদের দাবি, ‘বাউ-প্ল্যানটিফ’ খাওয়ানো ব্রয়লারের হাড়ের গঠন শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি হাড়ে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের পরিমাণ বাড়তে পারে। মুরগির দৈহিক তৎপরতা বৃদ্ধি, পালক ঘন ও উজ্জ্বল হওয়ার মতো পরিবর্তনও দেখা গেছে।গবেষণার ফলাফলে আরও দেখা গেছে, এসব মুরগির মাংসে স্বাস্থ্যকর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিডের পরিমাণ প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মাংসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য এবং গরমের ধকল বা হিট স্ট্রেস সহ্য করার সক্ষমতাও উন্নত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।দেশে তৈরি হতে পারে প্ল্যানটেইনের ভ্যালু চেইনগবেষণার প্রতিটি ট্রায়ালে প্রায় ৪৫০টি করে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে ৩৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তিনটি পৃথক পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।পাশাপাশি ময়মনসিংহ ও মানিকগঞ্জে উন্মুক্ত মাঠের পাশাপাশি এসি ও নন-এসি গ্রিনহাউসে প্ল্যানটেইন চাষ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এতে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্ল্যানটেইন উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখা গেছে।ড. আল-মামুন বলেন, এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ। এ জন্য সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বীজ কোম্পানি, ফিড মিল, পোলট্রি শিল্প, এনজিও ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আধুনিক প্রসেসিং, ব্লাস্ট ফ্রিজিং ও কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে এবং চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। গবেষণার বিভিন্ন ফলাফল নিয়ে ‘পোলট্রি সায়েন্স জার্নাল’ ও ‘ইতালিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্স’সহ বিভিন্ন সাময়িকীতে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পেটেন্টের জন্যও আবেদন করা হয়েছে।
গবেষকদের লক্ষ্য, প্ল্যানটেইনের বীজ উৎপাদন থেকে শুরু করে চাষ, ফিড অ্যাডিটিভ তৈরি এবং তা ব্যবহার করে কার্যকরী মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি টেকসই ‘সিড-টু-মিট’ ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা।