এক দশকের মধ্যে যেভাবে ভেঙে পড়ল লেস্টারের সাম্রাজ্য
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
২০১৬ সালে ফুটবল দুনিয়াকে অবিশ্বাসে ফেলে দিয়েছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এক অখ্যাত ক্লাব। নাম লেস্টার সিটি। বাজিকরদের ৫০০০-১ অডসকে হারিয়ে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের সেই গল্প আজও ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পের একটি। রূপকথার সেই বছরের ঠিক এক দশক পর, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই ক্লাবই নেমে গেছে ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তর লিগ ওয়ানে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) হাল সিটির বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্রয়ের পর নিশ্চিত হয়েছে লেস্টারের লিগ ওয়ানে অবনমন। এর মধ্য দিয়ে টানা দুই মৌসুমে অবনমন, যা ক্লাবটির দীর্ঘদিনের পতনের সবচেয়ে নির্মম চিত্র।
শিখর থেকে পিছলে পড়া
২০১৬-১৭ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল লেস্টার। ইউরোপে নিজেদের জায়গা তৈরি করছিল তারা। ২০২১ সালে এফএ কাপ জয়ের মাধ্যমে সেই ধারাবাহিকতা আরও শক্ত হয়।
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেই তৈরি হচ্ছিল সমস্যার বীজ। কোচ ব্রেন্ডন রজার্স তখনই সতর্ক করেছিলেন, ক্লাবকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আর হয়নি।
অর্থনীতি ও ভুল সিদ্ধান্ত
কোভিড-পরবর্তী সময়ে ক্লাবের মালিকানাধীন ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে। এর প্রভাব পড়ে দল গঠনে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় স্কোয়াড ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজেদের শক্তিশালী করতে থাকে। লেস্টার স্থির থাকতে গিয়ে আসলে পিছিয়ে পড়ে।
অস্থিরতা, কোচ বদল আর পরিচয় সংকট
গত কয়েক বছরে লেস্টার একের পর এক কোচ বদল করেছে। কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না। একেকজন কোচ একেক ধরনের খেলার ধরণ নিয়ে আসলেও দল কখনো স্থিরতা পায়নি।
এনজো মারেস্কা একবার দলকে চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে প্রিমিয়ার লিগে তুলেছিলেন। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। এরপর আবার পরিবর্তন, আবার নতুন শুরু, কিন্তু ফল একই।
ভিচাইয়ের মৃত্যু, ভাঙনের শুরু
তবে লেস্টারের পতনের সবচেয়ে বড় চিত্র সম্ভবত ২০১৮ সালে মালিক ভিচাই শ্রীবদ্ধনপ্রভার মৃত্যু। স্টেডিয়ামের কাছেই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ছিল এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। তিনি শুধু অর্থনৈতিক সমর্থনই দেননি, ক্লাবকে একটি দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
তার মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন তার ছেলে আইয়াওয়াট। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসা ও ক্লাব পরিচালনার চাপ, আর অভিজ্ঞতার অভাব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
মাঠে পতনের প্রতিচ্ছবি
চলতি মৌসুমে লেস্টারের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। শেষ ১৮ ম্যাচে মাত্র একটি জয় তাদের অবস্থার গভীরতা বুঝিয়ে দেয়।
পয়েন্ট কাটা, ধারাবাহিক ব্যর্থতা আর আত্মবিশ্বাসের অভাব দলটিকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়। সমর্থকদের ক্ষোভও প্রকাশ্যে চলে আসে।
সামনে আরও কঠিন বাস্তবতা
তৃতীয় বিভাগে নামা মানে শুধু মর্যাদা হারানো নয়, বড় আর্থিক ধাক্কাও। প্রিমিয়ার লিগের বিপুল আয়ের জায়গায় এখন অনেক কম সম্পদ নিয়ে চলতে হবে ক্লাবটিকে।
উচ্চ বেতনের খেলোয়াড়দের নিয়ে নতুন বাস্তবতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। দল পুনর্গঠন ছাড়া সামনে এগোনোর পথ নেই।
রূপকথার পরের গল্প
লেস্টারের গল্প এখন আর শুধু সাফল্যের নয়, বরং সতর্কবার্তা। কীভাবে ভুল পরিকল্পনা, অস্থিরতা আর সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়া একটি সফল ক্লাবকে দ্রুত নিচে নামিয়ে দিতে পারে, তারই উদাহরণ তারা।
এক দশকে শিখর থেকে তৃতীয় বিভাগে নেমে আসা এটি শুধু একটি পতনের গল্প নয়, বরং ফুটবলের কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত