বিলডাকাতিয়ায় ১৮ বিঘা আয়তনের ঘের রয়েছে বিমল কৃঞ্চ মন্ডলের। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের এই বাসিন্দা ঘেরের আইলে চাষ করেন নানা সবজি। ২০২৫ এর জুনে শুরু হওয়া ভারী বর্ষনে বিলের পানি বাড়তে থাকায় তলিয়ে যায় সবকিছু। চলতি বছরের অক্টোবরেও সরেনি পানি। এতে তার প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গত শনিবার ও গতকাল রোববার উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে কৃষক ও মৎস্য চাষীদের বিপুল ক্ষতির তথ্য জানাগেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রায় ৯ বছর পর এই বিলের আশপাশে জনপদে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বিলের পার্শবর্তী ভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদী দুটি পুরোপুরি ভরাট হওয়ায় পানি নামতে পারছে না। এতে প্রায় ১৮ হেক্টর জমির চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের ঘের, সবজিসহ নানা ফসলের ক্ষেত এখনও তলিয়ে আছে।
পানি উঠে রয়েছে ঘরেও। উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের রংপুর গ্রামের নুপুর হালদার, বটবেড়া গ্রামের জয়শ্রী মন্ডল শনিবার জানান, তাদের সবার বসত ভিটা তলিয়ে গেছে। ডিঙি নৌকায় রাস্তায় উঁচু রান্না করছেন৷ তলিয়ে যাওয়া ঘরের ভেতর মাচা বেধে রাতে গুমাতে হচ্ছে। রংপুর গ্রামে কথা হয় কৃষক রতন বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জন বালা, শিবপদ, মিহির মন্ডল ও প্রীতি ঢালীর সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বিল ডাকাতিয়ায় ১৫-২০ বিঘা জমি রয়েছে।
১৫ মাস ধরে তাদের সব জমি পানিতে নিমজ্জিত। ফলে ধান, মাছ, সবজি, কোনটাই চাষ করা যাচ্ছে না। আয় হারিয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন তারা। দেশের দ্ধিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়ার অবস্থান খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, ফুলতলা থানা, নগরীর খানজাহানআলী থানা ও আড়ংঘাটা থানা, যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার বিশাল অংশে। জলাবদ্ধতার কারনে এই বিল আশির দশকে আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়।
১৯৯২-৯৩ সালে ২২৯ কোটি টাকা খরচে খুলনা - যশোর পানি নিস্কাশন পুর্নবাসন প্রকল্প ( কেজেডিআরপি) বাস্তবায়ন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ( পাউবো)। এছাড়া ডুমুরিয়ার রংপুর ইউনিয়নের শুলুয়া স্লুইস গেট থেকে কৈয়ার শৌলমারী পর্যন্ত নদী খনন ও শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলা উপজেলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খাল খনন করা হয়। এরপর থেকে বিল ডাকাতিয়ার পানি কিছুটা নামতে শুরু করে। বেশ কয়েক বছর ডুমুরিয়া এলাকায় তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি।
২০১৭ সালে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও পাউবোর কাজে দ্রুত সময়ে তা সমাধান হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শোলমারী ও ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নতুন দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। নদী দুটি দিয়ে বিলের পানি নামতে পারছে না। এলাকাবাসীর ভাষ্য, পলি জমে পাউবোর বেড়িবাঁধের নদীর অংশ উঁচু ও বাঁধের ভেতর নিচু হয়েগেছে। একারনে পানি বিলডাকাতিয়া থেকে সরতে পারছে না। ভরাট হওয়া নদী খননের বিকল্প নেই।
উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই এবং রঘুনাথপুর, ধামালিয়া, রুদাঘরা, ডুমুরিয়া সদর,গুটুদিয়া ও খর্নিয়া ইউনিয়নের বহু গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। স্বরজমিনে দেখা যায়, চারদিক থইথই পানি। কোন বাড়ির মধ্যে এক থেকে দেড় ফুট, কোন বাড়ির আঙিনায় হাটুপানি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এছাড়া গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ। অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও পানি উঠে গেছে। এতে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।
মাজারখুটা গ্রামের মমিতা মন্ডলের পরিবার ১১ মাস পানির সঙ্গে বসবাস করছে। তার শোয়ার ঘরেও পানি। ভেতরে মাচা তৈরি করে রাতে ঘুমাতে হচ্ছে। রান্নাবান্না হচ্ছে সেখানেই। বটবেরা গ্রামের তমিলা সরকারের বাড়িতে দুটি বসত ঘর। সাত মাস ধরে দুটি ঘরের মেঝেই তলিয়ে আছে। শোয়ার খাটের ওপর মাটির চুলা বসিয়ে রান্নাবান্না করছেন। রাতে উচু খাটের ওপর দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে তাকে।
এমনকি এই পরিবারের শৌচাগারও পানিতে তলিয়ে আছে। বানারসি গ্রামের কৃষক পরিমল মন্ডল জানালেন, তার দুটি বসতঘর ও গোয়ালঘরে পানি উঠেছে ৯ মাস আগে। এখনও নামার লক্ষন নেই। চারটি গরু অন্য গ্রামে আত্মিয় বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। দিনের বেলায় পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে থাকলেও রাতে রংপুর গ্রামে অন্যের বাড়িতে ঘুমাতে যান। এই গ্রামের বাসিন্দা পরিমল মন্ডল ও কালীপদ দিনমুজুর করে সংসার চালাতেন।
কিন্তু জমি ঘের তলিয়ে থাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাদের মতো দরিদ্র মানুষ বিলে বড়শি ও ফাসজাল দিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করেন। কার কারও জীবিকা বিল থেকে তোলা শাপলা - শামুকের ওপর নির্ভরশীল। সাড়াতলা মজারখুটা গ্রামের কৃষক কমলেস, সতপা হালদার, যশোদা হালাদারের ভাষ্য এলাকায় কর্মসংস্থান নেই। সরকারি কোন সহায়তাও পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে পানি থইথই করছে। ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নিত্যদিনের কাজ করতে হয়। এভাবে শিশু সন্তানদের বিদ্যালয়ে আনা নেওয়া করতে হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারনে পানি দুষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ, ডায়রিয়া, বেড়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামানের দেওয়া তথ্য মতে, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় বিলডাকাতিয়ার মধ্যে ১২০ হেক্টর জমিতে ৪২০ মাছের ঘের রয়েছে।
এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ ঘের কোনমতে টিকে আছে। ৬৫ শতাংশ ঘের এখনও তলিয়ে আছে। জলাবদ্ধতার কারনে ১৫ মাসে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর - খুলনার উপপরিচালক মোঃ নজরুল ইসলামের ভাষ্য, বিল ডাকাতিয়া এলাকায় রোপা আমন, সবজি, মরিচসহ অন্যান্য ফসল ক্ষেতের বেশিরভাগই পানিতে নিমজ্জিত। তারা উপজেলা ভিত্তিক ক্ষতির পরিমান নির্নয়ের কাজ শুরু করেছেন।
শুধু বিলডাকাতিয়া এলাকায় কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার আলাদা কোন তালিকা তৈরি হয়নি। বিল ডাকাতিয়া সংলগ্ন ডুমুরিয়া উপজেলার ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানান জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল করিম। তার দেওয়া তথ্যমতে, তিন উপজেলার ৩১৩ টি গ্রামের ৩২ হাজার ১৫২ টি পরিবারের ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৩০ জন পানিবন্দি। কেজেডিআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বিল ডাকাতিয়া জলাবদ্ধতা মুক্ত হয়েছিল বলে জানান পাউবো বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে একবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। তখন একটি ছোট্ট প্রকপ্লের অধীনে কিছু কাজ করা হয়। আবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিলডাকাতিয়া ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। আপাতত ভাসমান কিছু এক্সক্যাভেটর দিয়ে নদী খালের পানি সরানো হচ্ছে। গ্রামের লোকজনও এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। চার - পাচ দিন ধরে কিছু এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নামছে।
ডুমুরিয়া জলাবদ্ধতা নিরসন করা নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল খুলনা - ৫ ( ডুমুরিয়া - ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আলী আসগার লবী বলেন, ইতিমধ্যে নদী - খাল খনন শুরু হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর তা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
বিলডাকাতিয়ায় ১৮ বিঘা আয়তনের ঘের রয়েছে বিমল কৃঞ্চ মন্ডলের। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর গ্রামের এই বাসিন্দা ঘেরের আইলে চাষ করেন নানা সবজি। ২০২৫ এর জুনে শুরু হওয়া ভারী বর্ষনে বিলের পানি বাড়তে থাকায় তলিয়ে যায় সবকিছু। চলতি বছরের অক্টোবরেও সরেনি পানি। এতে তার প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
গত শনিবার ও গতকাল রোববার উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে কৃষক ও মৎস্য চাষীদের বিপুল ক্ষতির তথ্য জানাগেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রায় ৯ বছর পর এই বিলের আশপাশে জনপদে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বিলের পার্শবর্তী ভদ্রা ও বুড়িভদ্রা নদী দুটি পুরোপুরি ভরাট হওয়ায় পানি নামতে পারছে না। এতে প্রায় ১৮ হেক্টর জমির চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের ঘের, সবজিসহ নানা ফসলের ক্ষেত এখনও তলিয়ে আছে।
পানি উঠে রয়েছে ঘরেও। উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের রংপুর গ্রামের নুপুর হালদার, বটবেড়া গ্রামের জয়শ্রী মন্ডল শনিবার জানান, তাদের সবার বসত ভিটা তলিয়ে গেছে। ডিঙি নৌকায় রাস্তায় উঁচু রান্না করছেন৷ তলিয়ে যাওয়া ঘরের ভেতর মাচা বেধে রাতে গুমাতে হচ্ছে। রংপুর গ্রামে কথা হয় কৃষক রতন বিশ্বাস, চিত্তরঞ্জন বালা, শিবপদ, মিহির মন্ডল ও প্রীতি ঢালীর সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের বিল ডাকাতিয়ায় ১৫-২০ বিঘা জমি রয়েছে।
১৫ মাস ধরে তাদের সব জমি পানিতে নিমজ্জিত। ফলে ধান, মাছ, সবজি, কোনটাই চাষ করা যাচ্ছে না। আয় হারিয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছেন তারা। দেশের দ্ধিতীয় বৃহত্তম হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়ার অবস্থান খুলনা জেলার ডুমুরিয়া, ফুলতলা থানা, নগরীর খানজাহানআলী থানা ও আড়ংঘাটা থানা, যশোরের অভয়নগর, কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার বিশাল অংশে। জলাবদ্ধতার কারনে এই বিল আশির দশকে আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়।
১৯৯২-৯৩ সালে ২২৯ কোটি টাকা খরচে খুলনা - যশোর পানি নিস্কাশন পুর্নবাসন প্রকল্প ( কেজেডিআরপি) বাস্তবায়ন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ( পাউবো)। এছাড়া ডুমুরিয়ার রংপুর ইউনিয়নের শুলুয়া স্লুইস গেট থেকে কৈয়ার শৌলমারী পর্যন্ত নদী খনন ও শলুয়া থেকে বিল ডাকাতিয়ার মাঝখান দিয়ে ফুলতলা উপজেলার জামিরা পর্যন্ত ৮০ ফুট চওড়া খাল খনন করা হয়। এরপর থেকে বিল ডাকাতিয়ার পানি কিছুটা নামতে শুরু করে। বেশ কয়েক বছর ডুমুরিয়া এলাকায় তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি।
২০১৭ সালে জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও পাউবোর কাজে দ্রুত সময়ে তা সমাধান হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শোলমারী ও ভদ্রা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নতুন দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। নদী দুটি দিয়ে বিলের পানি নামতে পারছে না। এলাকাবাসীর ভাষ্য, পলি জমে পাউবোর বেড়িবাঁধের নদীর অংশ উঁচু ও বাঁধের ভেতর নিচু হয়েগেছে। একারনে পানি বিলডাকাতিয়া থেকে সরতে পারছে না। ভরাট হওয়া নদী খননের বিকল্প নেই।
উপজেলার রংপুর ইউনিয়নের প্রায় পুরোটাই এবং রঘুনাথপুর, ধামালিয়া, রুদাঘরা, ডুমুরিয়া সদর,গুটুদিয়া ও খর্নিয়া ইউনিয়নের বহু গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। স্বরজমিনে দেখা যায়, চারদিক থইথই পানি। কোন বাড়ির মধ্যে এক থেকে দেড় ফুট, কোন বাড়ির আঙিনায় হাটুপানি। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। এছাড়া গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন মানুষ। অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেও পানি উঠে গেছে। এতে লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।
মাজারখুটা গ্রামের মমিতা মন্ডলের পরিবার ১১ মাস পানির সঙ্গে বসবাস করছে। তার শোয়ার ঘরেও পানি। ভেতরে মাচা তৈরি করে রাতে ঘুমাতে হচ্ছে। রান্নাবান্না হচ্ছে সেখানেই। বটবেরা গ্রামের তমিলা সরকারের বাড়িতে দুটি বসত ঘর। সাত মাস ধরে দুটি ঘরের মেঝেই তলিয়ে আছে। শোয়ার খাটের ওপর মাটির চুলা বসিয়ে রান্নাবান্না করছেন। রাতে উচু খাটের ওপর দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে তাকে।
এমনকি এই পরিবারের শৌচাগারও পানিতে তলিয়ে আছে। বানারসি গ্রামের কৃষক পরিমল মন্ডল জানালেন, তার দুটি বসতঘর ও গোয়ালঘরে পানি উঠেছে ৯ মাস আগে। এখনও নামার লক্ষন নেই। চারটি গরু অন্য গ্রামে আত্মিয় বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। দিনের বেলায় পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে থাকলেও রাতে রংপুর গ্রামে অন্যের বাড়িতে ঘুমাতে যান। এই গ্রামের বাসিন্দা পরিমল মন্ডল ও কালীপদ দিনমুজুর করে সংসার চালাতেন।
কিন্তু জমি ঘের তলিয়ে থাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাদের মতো দরিদ্র মানুষ বিলে বড়শি ও ফাসজাল দিয়ে মাছ ধরে বিক্রি করেন। কার কারও জীবিকা বিল থেকে তোলা শাপলা - শামুকের ওপর নির্ভরশীল। সাড়াতলা মজারখুটা গ্রামের কৃষক কমলেস, সতপা হালদার, যশোদা হালাদারের ভাষ্য এলাকায় কর্মসংস্থান নেই। সরকারি কোন সহায়তাও পাচ্ছেন না। বেশিরভাগ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে পানি থইথই করছে। ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নিত্যদিনের কাজ করতে হয়। এভাবে শিশু সন্তানদের বিদ্যালয়ে আনা নেওয়া করতে হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারনে পানি দুষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ, ডায়রিয়া, বেড়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ বদরুজ্জামানের দেওয়া তথ্য মতে, ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় বিলডাকাতিয়ার মধ্যে ১২০ হেক্টর জমিতে ৪২০ মাছের ঘের রয়েছে।
এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ ঘের কোনমতে টিকে আছে। ৬৫ শতাংশ ঘের এখনও তলিয়ে আছে। জলাবদ্ধতার কারনে ১৫ মাসে প্রায় ৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর - খুলনার উপপরিচালক মোঃ নজরুল ইসলামের ভাষ্য, বিল ডাকাতিয়া এলাকায় রোপা আমন, সবজি, মরিচসহ অন্যান্য ফসল ক্ষেতের বেশিরভাগই পানিতে নিমজ্জিত। তারা উপজেলা ভিত্তিক ক্ষতির পরিমান নির্নয়ের কাজ শুরু করেছেন।
শুধু বিলডাকাতিয়া এলাকায় কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার আলাদা কোন তালিকা তৈরি হয়নি। বিল ডাকাতিয়া সংলগ্ন ডুমুরিয়া উপজেলার ২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানান জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল করিম। তার দেওয়া তথ্যমতে, তিন উপজেলার ৩১৩ টি গ্রামের ৩২ হাজার ১৫২ টি পরিবারের ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৩০ জন পানিবন্দি। কেজেডিআরপি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বিল ডাকাতিয়া জলাবদ্ধতা মুক্ত হয়েছিল বলে জানান পাউবো বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আশরাফুল আলম।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে একবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। তখন একটি ছোট্ট প্রকপ্লের অধীনে কিছু কাজ করা হয়। আবার জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিলডাকাতিয়া ও আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। আপাতত ভাসমান কিছু এক্সক্যাভেটর দিয়ে নদী খালের পানি সরানো হচ্ছে। গ্রামের লোকজনও এতে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। চার - পাচ দিন ধরে কিছু এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নামছে।
ডুমুরিয়া জলাবদ্ধতা নিরসন করা নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল খুলনা - ৫ ( ডুমুরিয়া - ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আলী আসগার লবী বলেন, ইতিমধ্যে নদী - খাল খনন শুরু হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর তা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
