বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
চেকপোস্ট

মূল পাতা

স্বাস্থ্য

অতিরিক্ত ক্লান্তি হতে পারে সতর্কবার্তা

কিডনি নষ্ট হওয়ার আগেই সতর্ক হোন, যেসব পরিবর্তন দেখলে পরীক্ষা জরুরি

কিডনি নষ্ট হওয়ার আগেই সতর্ক হোন, যেসব পরিবর্তন দেখলে পরীক্ষা জরুরি
ছবি : আমেরিকান হসপিটাল অব প্যারিস

কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া, শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে কিডনি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ক্ষেত্রে শুরুতে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে কিডনির গঠন বা কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত থাকাকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এ রোগে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা গ্রহণ এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলে রোগের অগ্রগতি ধীর করা ও জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য

  • ডায়াবেটিস: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

  • উচ্চ রক্তচাপ: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আবার কিডনির রোগের কারণেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

  • পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের কিডনি রোগ থাকলে কারও কারও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

  • কিডনির অন্যান্য রোগ: কিডনির প্রদাহ, বংশগত রোগ, গঠনগত সমস্যা এবং মূত্রনালিতে দীর্ঘস্থায়ী বাধা কিডনির কার্যক্ষমতা কমাতে পারে।

  • ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন বা অনুপযুক্ত মাত্রায় সেবন করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক বা অজানা উপাদানের ভেষজ ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগের অগ্রগতি হলে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

১. পা, গোড়ালি বা মুখ ফুলে যাওয়া

কিডনি অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের করতে না পারলে শরীরে তরল জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি, হাত কিংবা মুখ ফুলে যেতে পারে। তবে হৃদ্‌যন্ত্র ও যকৃতের সমস্যাসহ অন্যান্য কারণেও শরীর ফুলে যেতে পারে।

২. প্রস্রাবের ধরন বদলে যাওয়া

আগের তুলনায় প্রস্রাবের পরিমাণ বা ঘনত্ব বদলে যাওয়া, রাতে বারবার প্রস্রাব করতে ওঠা কিংবা প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা দেওয়ার মতো পরিবর্তন খেয়াল করা প্রয়োজন। প্রস্রাবে ফেনা কখনো অতিরিক্ত প্রোটিন বের হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে ফেনাযুক্ত প্রস্রাব কিডনি রোগের প্রমাণ নয়।

৩. সব সময় ক্লান্তি বা দুর্বলতা লাগা

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। কিডনি থেকে তৈরি হওয়া ইরিথ্রোপয়েটিন হরমোন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। এই হরমোনের উৎপাদন কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৪. ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি

কিডনির কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। এতে ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা বমির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যার অন্য কারণও থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৫. ত্বক শুষ্ক হওয়া ও চুলকানি

কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে শরীরে খনিজ ও বর্জ্য পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা চুলকানির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে অ্যালার্জি ও ত্বকের বিভিন্ন রোগেও এমন উপসর্গ হতে পারে।

৬. পেশিতে টান বা খিঁচুনি

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। এতে পেশিতে টান, খিঁচুনি বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। নিয়মিত এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৭. শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের সমস্যা

শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে ফুসফুসে প্রভাব ফেললে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। উন্নত পর্যায়ের কিডনি রোগে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা ও মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে। তবে শ্বাসকষ্টের পেছনে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হঠাৎ বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ থাকলেই কিডনি রোগ হয়েছে এমন নয়। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ না থাকায় ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।

  • রক্তে ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর পরীক্ষা: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ব্যবহার করে আনুমানিক গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট বা ইজিএফআর হিসাব করা হয়। এর মাধ্যমে কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত ছেঁকে নিচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

  • প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা: কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তের প্রোটিন অ্যালবুমিন প্রস্রাবে চলে আসতে পারে। এ পরীক্ষা কিডনির ক্ষতির লক্ষণ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

  • অন্যান্য পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম বা অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন।

একটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই সব সময় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ নিশ্চিত করা যায় না। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, পরীক্ষার ফল এবং পূর্ববর্তী রিপোর্ট বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

কিছু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন

  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি।

  • উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তি।

  • হৃদ্‌রোগ বা রক্তনালির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।

  • পরিবারের সদস্যদের কিডনি বিকল হওয়ার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি।

  • আগে থেকেই কিডনির রোগ বা অস্বাভাবিক পরীক্ষার ফল রয়েছে এমন ব্যক্তি।

বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা ও প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদের ক্ষেত্রে কত ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা উচিত।

কিডনি রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণ, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। সব ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও সঠিক চিকিৎসায় রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

চিকিৎসার অংশ হিসেবে থাকতে পারে

  • রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

  • প্রয়োজন অনুযায়ী কিডনি সুরক্ষায় সহায়ক ওষুধ গ্রহণ।

  • রক্তস্বল্পতা ও খনিজের ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসা।

  • নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির অবস্থা পর্যবেক্ষণ।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।

রোগের অগ্রসর পর্যায়ে কিডনি শরীরের প্রয়োজনীয় কাজ যথেষ্টভাবে করতে না পারলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিডনি রোগ শনাক্ত হলেই ডায়ালাইসিস লাগবে, এমন নয়।

রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করুন: উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনি ক্ষতির বড় কারণ। নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলুন।

লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। রান্নায় ও খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ ব্যবহার কমিয়ে দিন।

সুষম খাবার খান: খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল ও পরিমিত প্রোটিনসহ পুষ্টিকর খাবার রাখুন। তবে কিডনি রোগ থাকলে পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন বা তরলের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে নিয়ন্ত্রণ করতে হতে পারে। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া কঠোর খাদ্যনিয়ম শুরু করবেন না।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত হাঁটা ও উপযোগী শারীরিক কার্যক্রম ওজন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক বা অজানা উপাদানের ভেষজ ওষুধ সেবন করবেন না।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন ও পর্যাপ্ত ঘুমান: সুস্থ জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

পানির চাহিদা বুঝে পান করুন: সবার জন্য প্রতিদিন একই পরিমাণ পানি পান করার নিয়ম নেই। কিডনি বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তরল গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শুধু শরীর খারাপ লাগার অপেক্ষায় থাকলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ কিংবা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা করান। পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের ধরন বদলে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবহেলা করবেন না।

সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাই কিডনির কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ‘Chronic Kidney Disease’ শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।

#স্বাস্থ্য_সচেতনতা #কিডনি_রোগ #কিডনি_সুস্থ_রাখুন

চেকপোস্ট

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


কিডনি নষ্ট হওয়ার আগেই সতর্ক হোন, যেসব পরিবর্তন দেখলে পরীক্ষা জরুরি

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কিডনি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া, শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে কিডনি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ক্ষেত্রে শুরুতে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরে কিডনির গঠন বা কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত থাকাকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এ রোগে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে সময়মতো রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা গ্রহণ এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনলে রোগের অগ্রগতি ধীর করা ও জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য

  • ডায়াবেটিস: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

  • উচ্চ রক্তচাপ: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। আবার কিডনির রোগের কারণেও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

  • পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের কিডনি রোগ থাকলে কারও কারও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

  • কিডনির অন্যান্য রোগ: কিডনির প্রদাহ, বংশগত রোগ, গঠনগত সমস্যা এবং মূত্রনালিতে দীর্ঘস্থায়ী বাধা কিডনির কার্যক্ষমতা কমাতে পারে।

  • ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার: কিছু ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন বা অনুপযুক্ত মাত্রায় সেবন করলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক বা অজানা উপাদানের ভেষজ ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। রোগের অগ্রগতি হলে শরীরে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

১. পা, গোড়ালি বা মুখ ফুলে যাওয়া

কিডনি অতিরিক্ত পানি ও লবণ বের করতে না পারলে শরীরে তরল জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি, হাত কিংবা মুখ ফুলে যেতে পারে। তবে হৃদ্‌যন্ত্র ও যকৃতের সমস্যাসহ অন্যান্য কারণেও শরীর ফুলে যেতে পারে।

২. প্রস্রাবের ধরন বদলে যাওয়া

আগের তুলনায় প্রস্রাবের পরিমাণ বা ঘনত্ব বদলে যাওয়া, রাতে বারবার প্রস্রাব করতে ওঠা কিংবা প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা দেওয়ার মতো পরিবর্তন খেয়াল করা প্রয়োজন। প্রস্রাবে ফেনা কখনো অতিরিক্ত প্রোটিন বের হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে ফেনাযুক্ত প্রস্রাব কিডনি রোগের প্রমাণ নয়।

৩. সব সময় ক্লান্তি বা দুর্বলতা লাগা

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। কিডনি থেকে তৈরি হওয়া ইরিথ্রোপয়েটিন হরমোন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। এই হরমোনের উৎপাদন কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি কিংবা অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৪. ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব বা বমি

কিডনির কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। এতে ক্ষুধা কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব বা বমির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যার অন্য কারণও থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

৫. ত্বক শুষ্ক হওয়া ও চুলকানি

কিডনি রোগের অগ্রসর পর্যায়ে শরীরে খনিজ ও বর্জ্য পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া বা চুলকানির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে অ্যালার্জি ও ত্বকের বিভিন্ন রোগেও এমন উপসর্গ হতে পারে।

৬. পেশিতে টান বা খিঁচুনি

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। এতে পেশিতে টান, খিঁচুনি বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। নিয়মিত এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৭. শ্বাসকষ্ট বা ঘুমের সমস্যা

শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে ফুসফুসে প্রভাব ফেললে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। উন্নত পর্যায়ের কিডনি রোগে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা ও মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে। তবে শ্বাসকষ্টের পেছনে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হঠাৎ বা তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণ থাকলেই কিডনি রোগ হয়েছে এমন নয়। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ না থাকায় ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।

  • রক্তে ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর পরীক্ষা: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ব্যবহার করে আনুমানিক গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট বা ইজিএফআর হিসাব করা হয়। এর মাধ্যমে কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত ছেঁকে নিচ্ছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

  • প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা: কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তের প্রোটিন অ্যালবুমিন প্রস্রাবে চলে আসতে পারে। এ পরীক্ষা কিডনির ক্ষতির লক্ষণ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

  • অন্যান্য পরীক্ষা: প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম বা অন্য পরীক্ষা দিতে পারেন।

একটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই সব সময় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ নিশ্চিত করা যায় না। রোগীর সামগ্রিক অবস্থা, পরীক্ষার ফল এবং পূর্ববর্তী রিপোর্ট বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

কিছু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন

  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি।

  • উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তি।

  • হৃদ্‌রোগ বা রক্তনালির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।

  • পরিবারের সদস্যদের কিডনি বিকল হওয়ার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি।

  • আগে থেকেই কিডনির রোগ বা অস্বাভাবিক পরীক্ষার ফল রয়েছে এমন ব্যক্তি।

বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা ও প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদের ক্ষেত্রে কত ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা উচিত।

কিডনি রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণ, পর্যায় এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। সব ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও সঠিক চিকিৎসায় রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

চিকিৎসার অংশ হিসেবে থাকতে পারে

  • রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

  • প্রয়োজন অনুযায়ী কিডনি সুরক্ষায় সহায়ক ওষুধ গ্রহণ।

  • রক্তস্বল্পতা ও খনিজের ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসা।

  • নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির অবস্থা পর্যবেক্ষণ।

  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।

রোগের অগ্রসর পর্যায়ে কিডনি শরীরের প্রয়োজনীয় কাজ যথেষ্টভাবে করতে না পারলে ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিডনি রোগ শনাক্ত হলেই ডায়ালাইসিস লাগবে, এমন নয়।

রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করুন: উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস কিডনি ক্ষতির বড় কারণ। নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলুন।

লবণ কম খান: অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। রান্নায় ও খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ ব্যবহার কমিয়ে দিন।

সুষম খাবার খান: খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল ও পরিমিত প্রোটিনসহ পুষ্টিকর খাবার রাখুন। তবে কিডনি রোগ থাকলে পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন বা তরলের পরিমাণ ব্যক্তিভেদে নিয়ন্ত্রণ করতে হতে পারে। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া কঠোর খাদ্যনিয়ম শুরু করবেন না।

নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত হাঁটা ও উপযোগী শারীরিক কার্যক্রম ওজন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথানাশক বা অজানা উপাদানের ভেষজ ওষুধ সেবন করবেন না।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন ও পর্যাপ্ত ঘুমান: সুস্থ জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

পানির চাহিদা বুঝে পান করুন: সবার জন্য প্রতিদিন একই পরিমাণ পানি পান করার নিয়ম নেই। কিডনি বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তরল গ্রহণ করা প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেরই কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শুধু শরীর খারাপ লাগার অপেক্ষায় থাকলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ কিংবা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা করান। পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের ধরন বদলে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবহেলা করবেন না।

সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া এবং ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখাই কিডনির কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ‘Chronic Kidney Disease’ শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।


চেকপোস্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ 

কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত