১০ টির মধ্যে ৬ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ, খুলনাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং

ইরান, যুক্তরাস্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রভাবে জালানী সংকট তীব্র হওয়ায় খুলনা অঞ্চলের বিদুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে। জালানী সংকটে ১০ বিদুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৬ টি বন্ধ থাকায় উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে, ফলে খুলনাঞ্চলের শহর ও গ্রামে শুরু হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনাঞ্চলে ছোট- বড় মিলিয়ে ১০ টি বিদুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো সন্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
তবে জালানী সংকটের কারনে খুলনা – ৩৩০ মেগাওয়াট, ফরিদপুর – ৫০ মেগাওয়াট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি খুলনা খালিশপুর – ২২৫ মেগাওয়াট, মধুমতি – ১০০ মেগাওয়াট এবং রুপসা – ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রসহ মোট ৬ টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রস্তুতি থাকা সত্বেও উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। খুলনা – ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো: আলমগীর মাহফুজুর রহমান বলেন, জালানী সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারনে সক্ষমতা থাকা সত্বেও এই কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা এনএলডিসি থেকে বিদ্যুতের চাহিদা পাচ্ছিনা।
আমাদের হাতে কোন জালানী নেই। জালানী পাওয়ার সাপেক্ষে আমরা কেন্দ্রটি চালাতে প্রস্তুত আছি। অন্যদিকে, বিদেশি ঋন সহায়তায় নির্মিত কয়লা ভিত্তিক রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিতরনকারী সংস্থাগুলো অপচয় রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ( ওজোপাডিকোর) ব্যাবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান বলেন, সীমিত সরবরাহের মধ্যে চাহিদা সামাল দিতে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের অপচয় কমাতে সচেতনামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করছি। সেখানে আমরা তাদের বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে অনুরোধ করছি। সেই অনুরোধেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকান, শপিংমল, সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে বন্ধ রাখতে বলেছি। এদিকে চলমান সংকটকে বৈশ্বিক জালানী অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন,ইরান- যুক্তরাস্ট্র- ইযরাইলের উত্তেজনার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জালানী সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশে। একটি সংবাদ সন্মেলনে ” প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম ( ফেড) ” জানায়, দেশের এলএনজি আমদানির ৬৮-৭৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ হরমুজ প্রনালির ওপর নির্ভরশীল। এই রুটে সরবরাহ ব্যহত হলে জাতীয় জালানী নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়ে। সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। গ্যাস ও তেলের ঘাটতিতে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহ্নত থাকছে।
একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা শ্রম বাজারেও চাপ তৈরি করছে। ব্যয় বিশ্লেষনে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলের প্রতি ইউনিট বিদুৎ উৎপাদনে খরচ ১৮ টাকার বেশি হলেও সৌর বিদুতে তা প্রায় অর্ধেক, প্রায় ৯ টাকা। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা জীবাশ্ম জালানী নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়ন যোগ্য জালানীতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রতিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেন, বর্তমান সংকট থেকে উওরনে নবায়নযোগ্য জালানীর বিকল্প নেই।
টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ব্যাবস্থায় দ্রুত রুপান্তর না ঘটালে ভবিষ্যতে সংকট আরো দীর্ঘ হবে। তাদের মতে, দেশের ৪ কোটির বেশি পরিবারের ছাঁদের একটি বড় অংশ ব্যবহার করে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌর বিদুৎ উৎপাদন সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিখাতে সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। সংকট মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে – সৌর সরঞ্জামে শুল্ক- ভ্যাট প্রত্যাহার, বাড়ি ভিত্তিক সৌর প্যানেলে ভর্তুকি, দ্রুত সৌর পার্ক অনুমোদন এবং বিদুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জালানীর বিকেন্দ্রীকরন।
সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রতিবেশ সুরক্ষা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ নন্দী বলেছেন, সময়মত নীতিগত পরিবর্তন না আনলে জালানী নির্ভরতা আরো বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা অর্থনীতি ও জালানী নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, সারা পৃথিবীতে যেখানে বিকল্প জালানী হিসেবে সৌর শক্তির উপর নির্ভরতা বাড়ানো। তাই তেলের জালানীর উপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর শক্তি নিয়ে পরিকল্পনা সাজানোর দাবি জানান তিনি।























