ঢাকা ১০:২১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রাম ডুবিয়ে শহরে আলো!

চেকপোস্ট নিউজ::
8

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে দেশ। ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন। দেশজুড়ে চরম আকার নিয়েছে লোডশেডিং। বিপর্যস্ত শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের জনজীবন। তবে জেলা শহরে লোডশেডিংয়ের প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও গ্রামের চিত্র ভয়ানক। শিশু-বৃদ্ধরা পড়েছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। পচছে ব্যবসায়ীর পণ্য। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়। আবাদের পানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। শিকেয় উঠেছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখাও। আগামীর সময়ের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত-

চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ ঝালকাঠিতে

চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় ঝালকাঠি জেলা জুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাসহ সব ক্ষেত্রেই পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

‘বোরো ধান আমাদের প্রধান ফসল। এ সময়টা সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। পানি না থাকলে ধানের সমস্যা হবে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। পুরো দিনে এক বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যায় না’

‎‘জেলায় দিনে প্রায় ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও তীব্র গরমের কারণে সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় চাহিদার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে’— এমনটি জানালেন জেলা বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা।

লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন জেলার শিক্ষার্থীরা। বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রাথমিক বৃত্তি, এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইন ক্লাস, ইউটিউবসহ ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনাও। ‎
‎ব্যবসা-বাণিজ্যেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে বিস্তৃত পরিসরে। শহর ও বাজার এলাকার দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতা উপস্থিতি কমে যাচ্ছে এবং বিক্রি হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রিজ নির্ভর ব্যবসা— মিষ্টির দোকান, আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নষ্ট হচ্ছে পণ্য।

এছাড়া ছোট কারখানা, ওয়ার্কশপ ও স্থানীয় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ নির্ভর যন্ত্রপাতি চালু রাখতে না পারায় উৎপাদন কমে গেছে। এতে শ্রমিকদের আয়েও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকেরা নিয়মিত চার্জ দিতে না পারায় নির্ধারিত সময় সড়কে নামতে পারছেন না। এতে তাদের কমেছে দৈনিক আয়।

‘চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিং এড়ানোর সুযোগ নেই’

‎অন্যদিকে মোবাইল, ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সেবাও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ (ওয়াইফাই) সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। একই সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারে বিদ্যুৎ সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছে নেটওয়ার্ক।
‎এছাড়া তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তাদের শরীরে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

‘ঘনঘন লোডশেডিং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গরম। ফলে পরিস্থিতি আরও কষ্টদায়ক।’—বলছিলেন নলছিটি উপজেলার সমাজকর্মী সাথী আক্তার।

‎আগের থেকে অনেক আয় কমেছে ইজিবাইক চালক শহিদের। বললেন ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো ব্যাটারি চার্জ দিতে পারি না। ফলে নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারছি না। আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে আয়ও।’

‘পোষাক ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা শুরুই হয় সন্ধ্যার পরে কিন্তু সরকার তো একটা নির্দিষ্ট সময় দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এখন আমাদের তো মাথায় হাত। এরকম চললে ব্যবসা টিকবে না’—হতাশা মাখা চোখে বললেন ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান।

‎তীব্র গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) টিএম মেহেদী হাসান সানী। তার মতে, শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হওয়ার ফলে তৈরি হয় দ্রুত পানিশূন্যতা।

লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেন ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান। বললেন ‘চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিং এড়ানোর সুযোগ নেই’।‎

একই সুরে কথা বললেন জেলা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম। ‘জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী রোটেশন পদ্ধতিতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় হচ্ছে লোডশেডিং।’

শহরের চেয়ে গ্রামে কয়েকগুণ বেশি লোডশেডিং

সারা দেশের মতো মাদারীপুরেও বইছে তাপপ্রবাহ। এর মধ্যেই চলছে ঘন ঘন লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে কয়েকগুণ বেশি লোডশেডিং চলছে। এ অবস্থায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলাবাসীর জনজীবন।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দু-একদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা দেখছেন তারা।

‘বোরো ধান আমাদের প্রধান ফসল। এ সময়টা সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। পানি না থাকলে ধানের সমস্যা হবে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। পুরো দিনে এক বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যায় না। এ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি’— বলছিলেন সদর উপজেলার তালতলা গ্রামের গ্রামের কৃষক আলী হোসেন।

হতাশার সুরে একই কথা জানালেন কালকিনি উপজেলার রমজানপুর গ্রামের আরেক কৃষক বলাই চন্দ্র মল্লিক। বললেন, ‘এখন বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসবে সেই অপেক্ষা করতে হয়।’

‘আমাদের গ্রামে দিনে রাতে মিলে এক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে না। আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা। তীব্র গরমে ঠিকমতো পড়তেও পারছে না’ বলছিলেন চরহোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির শেখ।

তীব্র গরমে দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে মাদারীপুরে ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রির কাছাকাছি বিরাজ করেছ তাপমাত্রা।

‘সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে যায়। গভীর রাতেও বিদ্যুৎ আসে না। তা ছাড়া যেটুকু সময় বিদ্যুৎ থাকে প্রচণ্ড গরমে ফ্যান চালিয়েও ঘরে থাকা যায় না। আর বিদ্যুৎ না থাকলে মনে হয় ‘ভয়ংকর আজাব’ শুরু হলো। বাইরে থাকাও যায় না মশার যন্ত্রণায়’— বলছিলেন ব্রিজ বাজার গ্রামের পড়েস মন্ডল।

‘সূর্যের অনেক তাপ। রোদে শরীর পুড়ে যায়। মনে হয় যেন চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। শরীর ঘেমে যায়। শরীর দুর্বল হয়ে আসে। রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হয়’ বলছিলেন রিকশাচালক মো. রিয়ান আলী মিয়া।

‘প্রচণ্ড গরমে শিশুদের স্কিনের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বয়স্কদের কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিসহ হার্ট অ্যার্টাকের সম্ভাবনা থাকে’ বলছিলেন মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও অখিল সরকার।

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে বললেন জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায়। তার মতে, এপ্রিলের শুরু থেকেই গরম বাড়ছে। সে কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। এছাড়া অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানায় আগের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। এ জন্য হচ্ছে লোডশেডিং।

যশোরে চাহিদার শতভাগ বিদ্যুৎ শহরে, গ্রামে অর্ধেক

লোডশেডিং নেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর অনিন্দ্য ইসলাম অমিততের সংসদীয় আসন যশোরে (সদর)। অপর দিকে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছে না জেলার বাকি সাত উপজেলা।

শহরে লোডশেডিং না থাকলেও যশোরে গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পর্লী বিদ্যুতের জোনার অফিসে চাহিদার অর্ধের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে । ফলে গ্রামে প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বোরো আবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন চাষীরা। আর রাতে লোডশেডিং বেশি হওয়ায় কষ্ট পাচ্ছে শিশুসহ সব বয়সী মানুষ। সেই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়।

যশোর শহরে কোনো লোডশেডিং নেই। অপরদিকে জেলার বাকী সাত উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ-২ মনিরামপুর জোনাল অফিস সূত্র জানায়, যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর তিন উপজেলায় মোট চাহিদা ছিল ৭৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কেশবপুর উপজেলার চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। পওয়া গেছে ১১ মেগাওয়াট। মনিরামপুর উপজেলার চাহিদা ৩৫ মেগাওয়াট। পাওয়া গেছে ১৮ মেগাওয়াট। অভয়নগর উপজেলার চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। পওয়া গেছে ১০ মেগাওয়াট।

এদিকে যশোর পর্লী বিদ্যুৎ -১ জোনার অফিস সূত্র জানায়, যশোর শার্শা, বাঘারপাড়া, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলায় মোট চাগিদা ১০৫ মেগাওয়াট। গতকাল পাওয়া গিয়ে ছিল ৭২ মেগাওয়াট।

যশোর জেলার সাত উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। সেখানে দিন রাত মিলে ঘাটতি থাকছে ৬৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে জেলায় প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

‘লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না। রাতে বিদ্যুৎ গেলে সকালে আসে। এতে করে ঘুমটাও ঠিকমতো হচ্ছে না’ বলছিলেন উপজেলা কীর্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা জিল্লুর রহমান।
একই সুরে কথা বললেন কেশবপুরের বালিয়াডাঙা গ্রামের জাকির হোসেন। তার মতে, গ্রামের বিদ্যুৎ খাকছে না বললেই চলে। সন্ধ্যার পর পরই কারেন্ট চলে যায়।

লোডশেডিংয়ের কথা মানতে নারাজ ওজোপাডিকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন। তার ভাষ্য, যশোর মোট চাহিদা ছিল ৪৯ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ৪৯ মেগাওয়াট। ফলে কোনো লোডশেডিংয় নেই।

নাসির উদ্দিনের কথা উড়িয়ে দিলেন জেলা পল্লী বিদ্যুৎ-২ জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে মাঝে মাঝে লোডশেডিং হচ্ছে।

তার মতে, খুলনা জোনে ১০টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে না।

স্থবির নরসিংদীর জনজীবন

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। সারা দিনে বিদ্যুতের দেখা মেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। রাতের বেলা তো বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। ঘনঘন লোডশেডিং-এর কারণে বিভিন্ন শিল্প কারখানা চলছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মিলের শ্রমিকরা। কাজ না করলে পাচ্ছেন না মজুরি।

সদর উপজেলার মূলপাড়ার কৃষক মহিবুল্লাহ ফরাজী জানান, সারা দিনে এক বিঘা জমিতে পানি নিতে পারিনি। একবার বিদ্যুৎ যায় একবার আসে এভাবে কৃষিকাজ করা যায় না। তেল এবং বিদ্যুতের সমস্যা দ্রুত সমাধান চান মুহিবুল্লাহ।

কখন বিদ্যুৎ যায়, তা নয় কখন আসে সে প্রশ্ন গোপালগঞ্জবাসীর

জেলার লোডশেডিং নিয়ে কথা হচ্ছিল কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা গ্রামের পঙ্কজ মণ্ডলের সঙ্গে। বললেন, ‘কখন বিদ্যুৎ যায়, এমন প্রশ্ন নয়, কখন আসে এই প্রশ্ন গোপালগঞ্জবাসীর।’

লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈনুদ্দিন। তার মতে, প্রায় ৩০ হাজার বিদ্যুতের গ্রাহক আছেন। বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৬ মেগাওয়াট। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৮ মেগাওয়াট।

বান্দরবান-কক্সবাজারে সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম

বিদ্যুৎ বিভাগের বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম আমির জানান, বান্দরবান বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় স্বাভাবিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ পাচ্ছি ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। বৃহস্পতি ও শুক্রবার পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৬ মেগাওয়াটের কম। এইটুকু দিয়েই সামাল দিতে হচ্ছে পুরো জেলা।

‘সন্ধ্যার পর থেকে নাইক্ষংছড়ি ও রামুতে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না বললেই চলে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। সারা রাত নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে’নাইক্ষ্যংছড়িরর বাসিন্দা মাঈনুদ্দিন খালেদ।

কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী দীপ্ত বড়ুয়া বলেন, কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন এলাকাগুলোতে ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে ৯০ মেগাওয়াট। এ জন্যই লোডশেডিং হচ্ছে।
ঝিনাইদহে একদিকে তাপদাহ, অন্যদিকে লোডশেডিং

বৈশাখের তীব্র তাপদাহে পুড়ছে জেলার মানুষ, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং থাকার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সকাল থেকে সুর্যেও তাপ ছড়িয়ে পড়ছে জেলা জুড়ে। ফলে মানুষসহ প্রাণিকুল দিশেহারা। আরেক দিকে বেশির ভাগ সময় বিদুৎ না থাকার কারণে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষের পোাহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি কয়েকদিনে জাতীয় সমস্যা হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

‘সরকারের বেধে দেওয়া সময়ে দোকান বন্ধের কারণে ব্যবসা যেমন কম হচ্ছে, তেমনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনে তিন-চারবার বিদুৎ না থাকায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি’— বলছিলেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ি আসলাম পারভেজ।

জেলা পল্লী বিদুৎ জেনারেল ম্যানেজার ওমর আলী জানান, জেলার ৬টি উপজেলাতে দিনের বেলায় চাহিদা রয়েছে ৭২ মেগাওয়াট ও রাতে ৮০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিডের কারণে বিদুৎ কম থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি ওমরের।

ওজোপাডিকো গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তম কুমার সাধু জানান, দিনের বেলায় প্রয়োজন ৭০-৮০ মেগাওয়াট। সাপ্লাই পাচ্ছেন ৫০ মেগাওয়াট। আর রাতের বেলায় ১২০ মেগাওয়াট প্রয়োজন, কিন্তু পাচ্ছেন ১০০ মেগাওয়াট।

সুত্র: আগামীর সময় 

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ০৮:২৭:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
৫০৩ বার পড়া হয়েছে

গ্রাম ডুবিয়ে শহরে আলো!

আপডেট সময় ০৮:২৭:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
8

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে দেশ। ঘাটতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন। দেশজুড়ে চরম আকার নিয়েছে লোডশেডিং। বিপর্যস্ত শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের জনজীবন। তবে জেলা শহরে লোডশেডিংয়ের প্রভাব তুলনামূলক কম হলেও গ্রামের চিত্র ভয়ানক। শিশু-বৃদ্ধরা পড়েছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। পচছে ব্যবসায়ীর পণ্য। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়। আবাদের পানি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। শিকেয় উঠেছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখাও। আগামীর সময়ের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত-

চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ ঝালকাঠিতে

চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় ঝালকাঠি জেলা জুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাসহ সব ক্ষেত্রেই পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

‘বোরো ধান আমাদের প্রধান ফসল। এ সময়টা সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। পানি না থাকলে ধানের সমস্যা হবে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। পুরো দিনে এক বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যায় না’

‎‘জেলায় দিনে প্রায় ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও তীব্র গরমের কারণে সন্ধ্যার পর তা বেড়ে ২২ থেকে ২৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় চাহিদার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে’— এমনটি জানালেন জেলা বিদ্যুৎ অফিসের এক কর্মকর্তা।

লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছেন জেলার শিক্ষার্থীরা। বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রাথমিক বৃত্তি, এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইন ক্লাস, ইউটিউবসহ ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনাও। ‎
‎ব্যবসা-বাণিজ্যেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে বিস্তৃত পরিসরে। শহর ও বাজার এলাকার দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতা উপস্থিতি কমে যাচ্ছে এবং বিক্রি হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রিজ নির্ভর ব্যবসা— মিষ্টির দোকান, আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নষ্ট হচ্ছে পণ্য।

এছাড়া ছোট কারখানা, ওয়ার্কশপ ও স্থানীয় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ নির্ভর যন্ত্রপাতি চালু রাখতে না পারায় উৎপাদন কমে গেছে। এতে শ্রমিকদের আয়েও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চালকেরা নিয়মিত চার্জ দিতে না পারায় নির্ধারিত সময় সড়কে নামতে পারছেন না। এতে তাদের কমেছে দৈনিক আয়।

‘চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিং এড়ানোর সুযোগ নেই’

‎অন্যদিকে মোবাইল, ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সেবাও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্রডব্যান্ড সংযোগ (ওয়াইফাই) সেবা পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। একই সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারে বিদ্যুৎ সংকটে দুর্বল হয়ে পড়েছে নেটওয়ার্ক।
‎এছাড়া তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তাদের শরীরে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

‘ঘনঘন লোডশেডিং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গরম। ফলে পরিস্থিতি আরও কষ্টদায়ক।’—বলছিলেন নলছিটি উপজেলার সমাজকর্মী সাথী আক্তার।

‎আগের থেকে অনেক আয় কমেছে ইজিবাইক চালক শহিদের। বললেন ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো ব্যাটারি চার্জ দিতে পারি না। ফলে নিয়মিত গাড়ি চালাতে পারছি না। আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে আয়ও।’

‘পোষাক ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা শুরুই হয় সন্ধ্যার পরে কিন্তু সরকার তো একটা নির্দিষ্ট সময় দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এখন আমাদের তো মাথায় হাত। এরকম চললে ব্যবসা টিকবে না’—হতাশা মাখা চোখে বললেন ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান।

‎তীব্র গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) টিএম মেহেদী হাসান সানী। তার মতে, শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হওয়ার ফলে তৈরি হয় দ্রুত পানিশূন্যতা।

লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেন ঝালকাঠি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. জুলফিকার রহমান। বললেন ‘চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় লোডশেডিং এড়ানোর সুযোগ নেই’।‎

একই সুরে কথা বললেন জেলা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো)-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকিরুল ইসলাম। ‘জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী রোটেশন পদ্ধতিতে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় হচ্ছে লোডশেডিং।’

শহরের চেয়ে গ্রামে কয়েকগুণ বেশি লোডশেডিং

সারা দেশের মতো মাদারীপুরেও বইছে তাপপ্রবাহ। এর মধ্যেই চলছে ঘন ঘন লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে কয়েকগুণ বেশি লোডশেডিং চলছে। এ অবস্থায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলাবাসীর জনজীবন।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দু-একদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা দেখছেন তারা।

‘বোরো ধান আমাদের প্রধান ফসল। এ সময়টা সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। পানি না থাকলে ধানের সমস্যা হবে। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ আসে আর যায়। পুরো দিনে এক বিঘা জমিতে পানি দেওয়া যায় না। এ নিয়ে খুব চিন্তায় আছি’— বলছিলেন সদর উপজেলার তালতলা গ্রামের গ্রামের কৃষক আলী হোসেন।

হতাশার সুরে একই কথা জানালেন কালকিনি উপজেলার রমজানপুর গ্রামের আরেক কৃষক বলাই চন্দ্র মল্লিক। বললেন, ‘এখন বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসবে সেই অপেক্ষা করতে হয়।’

‘আমাদের গ্রামে দিনে রাতে মিলে এক ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এতে ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে না। আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা। তীব্র গরমে ঠিকমতো পড়তেও পারছে না’ বলছিলেন চরহোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা জাকির শেখ।

তীব্র গরমে দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে মাদারীপুরে ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রির কাছাকাছি বিরাজ করেছ তাপমাত্রা।

‘সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে যায়। গভীর রাতেও বিদ্যুৎ আসে না। তা ছাড়া যেটুকু সময় বিদ্যুৎ থাকে প্রচণ্ড গরমে ফ্যান চালিয়েও ঘরে থাকা যায় না। আর বিদ্যুৎ না থাকলে মনে হয় ‘ভয়ংকর আজাব’ শুরু হলো। বাইরে থাকাও যায় না মশার যন্ত্রণায়’— বলছিলেন ব্রিজ বাজার গ্রামের পড়েস মন্ডল।

‘সূর্যের অনেক তাপ। রোদে শরীর পুড়ে যায়। মনে হয় যেন চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। শরীর ঘেমে যায়। শরীর দুর্বল হয়ে আসে। রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হয়’ বলছিলেন রিকশাচালক মো. রিয়ান আলী মিয়া।

‘প্রচণ্ড গরমে শিশুদের স্কিনের সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বয়স্কদের কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিসহ হার্ট অ্যার্টাকের সম্ভাবনা থাকে’ বলছিলেন মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও অখিল সরকার।

গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে বললেন জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায়। তার মতে, এপ্রিলের শুরু থেকেই গরম বাড়ছে। সে কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। এছাড়া অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানায় আগের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। এ জন্য হচ্ছে লোডশেডিং।

যশোরে চাহিদার শতভাগ বিদ্যুৎ শহরে, গ্রামে অর্ধেক

লোডশেডিং নেই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর অনিন্দ্য ইসলাম অমিততের সংসদীয় আসন যশোরে (সদর)। অপর দিকে চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছে না জেলার বাকি সাত উপজেলা।

শহরে লোডশেডিং না থাকলেও যশোরে গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। পর্লী বিদ্যুতের জোনার অফিসে চাহিদার অর্ধের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে । ফলে গ্রামে প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বোরো আবাদ নিয়ে উদ্বিগ্ন চাষীরা। আর রাতে লোডশেডিং বেশি হওয়ায় কষ্ট পাচ্ছে শিশুসহ সব বয়সী মানুষ। সেই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়।

যশোর শহরে কোনো লোডশেডিং নেই। অপরদিকে জেলার বাকী সাত উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট।

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ-২ মনিরামপুর জোনাল অফিস সূত্র জানায়, যশোরের কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর তিন উপজেলায় মোট চাহিদা ছিল ৭৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কেশবপুর উপজেলার চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। পওয়া গেছে ১১ মেগাওয়াট। মনিরামপুর উপজেলার চাহিদা ৩৫ মেগাওয়াট। পাওয়া গেছে ১৮ মেগাওয়াট। অভয়নগর উপজেলার চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। পওয়া গেছে ১০ মেগাওয়াট।

এদিকে যশোর পর্লী বিদ্যুৎ -১ জোনার অফিস সূত্র জানায়, যশোর শার্শা, বাঘারপাড়া, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলায় মোট চাগিদা ১০৫ মেগাওয়াট। গতকাল পাওয়া গিয়ে ছিল ৭২ মেগাওয়াট।

যশোর জেলার সাত উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। সেখানে দিন রাত মিলে ঘাটতি থাকছে ৬৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে জেলায় প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।

‘লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। আধা ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘণ্টা থাকে না। রাতে বিদ্যুৎ গেলে সকালে আসে। এতে করে ঘুমটাও ঠিকমতো হচ্ছে না’ বলছিলেন উপজেলা কীর্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা জিল্লুর রহমান।
একই সুরে কথা বললেন কেশবপুরের বালিয়াডাঙা গ্রামের জাকির হোসেন। তার মতে, গ্রামের বিদ্যুৎ খাকছে না বললেই চলে। সন্ধ্যার পর পরই কারেন্ট চলে যায়।

লোডশেডিংয়ের কথা মানতে নারাজ ওজোপাডিকো বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন। তার ভাষ্য, যশোর মোট চাহিদা ছিল ৪৯ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ৪৯ মেগাওয়াট। ফলে কোনো লোডশেডিংয় নেই।

নাসির উদ্দিনের কথা উড়িয়ে দিলেন জেলা পল্লী বিদ্যুৎ-২ জেনারেল ম্যানেজার হাদিউজ্জামান। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে মাঝে মাঝে লোডশেডিং হচ্ছে।

তার মতে, খুলনা জোনে ১০টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে না।

স্থবির নরসিংদীর জনজীবন

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। সারা দিনে বিদ্যুতের দেখা মেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। রাতের বেলা তো বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। ঘনঘন লোডশেডিং-এর কারণে বিভিন্ন শিল্প কারখানা চলছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মিলের শ্রমিকরা। কাজ না করলে পাচ্ছেন না মজুরি।

সদর উপজেলার মূলপাড়ার কৃষক মহিবুল্লাহ ফরাজী জানান, সারা দিনে এক বিঘা জমিতে পানি নিতে পারিনি। একবার বিদ্যুৎ যায় একবার আসে এভাবে কৃষিকাজ করা যায় না। তেল এবং বিদ্যুতের সমস্যা দ্রুত সমাধান চান মুহিবুল্লাহ।

কখন বিদ্যুৎ যায়, তা নয় কখন আসে সে প্রশ্ন গোপালগঞ্জবাসীর

জেলার লোডশেডিং নিয়ে কথা হচ্ছিল কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা গ্রামের পঙ্কজ মণ্ডলের সঙ্গে। বললেন, ‘কখন বিদ্যুৎ যায়, এমন প্রশ্ন নয়, কখন আসে এই প্রশ্ন গোপালগঞ্জবাসীর।’

লোডশেডিংয়ের কথা স্বীকার করলেন ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈনুদ্দিন। তার মতে, প্রায় ৩০ হাজার বিদ্যুতের গ্রাহক আছেন। বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৬ মেগাওয়াট। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৮ মেগাওয়াট।

বান্দরবান-কক্সবাজারে সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম

বিদ্যুৎ বিভাগের বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম আমির জানান, বান্দরবান বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় স্বাভাবিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ পাচ্ছি ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট। বৃহস্পতি ও শুক্রবার পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৬ মেগাওয়াটের কম। এইটুকু দিয়েই সামাল দিতে হচ্ছে পুরো জেলা।

‘সন্ধ্যার পর থেকে নাইক্ষংছড়ি ও রামুতে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না বললেই চলে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। সারা রাত নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে’নাইক্ষ্যংছড়িরর বাসিন্দা মাঈনুদ্দিন খালেদ।

কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী দীপ্ত বড়ুয়া বলেন, কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন এলাকাগুলোতে ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে ৯০ মেগাওয়াট। এ জন্যই লোডশেডিং হচ্ছে।
ঝিনাইদহে একদিকে তাপদাহ, অন্যদিকে লোডশেডিং

বৈশাখের তীব্র তাপদাহে পুড়ছে জেলার মানুষ, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং থাকার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সকাল থেকে সুর্যেও তাপ ছড়িয়ে পড়ছে জেলা জুড়ে। ফলে মানুষসহ প্রাণিকুল দিশেহারা। আরেক দিকে বেশির ভাগ সময় বিদুৎ না থাকার কারণে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষের পোাহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি কয়েকদিনে জাতীয় সমস্যা হয়েছে। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে চেষ্টা করা হচ্ছে।

‘সরকারের বেধে দেওয়া সময়ে দোকান বন্ধের কারণে ব্যবসা যেমন কম হচ্ছে, তেমনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনে তিন-চারবার বিদুৎ না থাকায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি’— বলছিলেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ি আসলাম পারভেজ।

জেলা পল্লী বিদুৎ জেনারেল ম্যানেজার ওমর আলী জানান, জেলার ৬টি উপজেলাতে দিনের বেলায় চাহিদা রয়েছে ৭২ মেগাওয়াট ও রাতে ৮০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিডের কারণে বিদুৎ কম থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে দাবি ওমরের।

ওজোপাডিকো গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তম কুমার সাধু জানান, দিনের বেলায় প্রয়োজন ৭০-৮০ মেগাওয়াট। সাপ্লাই পাচ্ছেন ৫০ মেগাওয়াট। আর রাতের বেলায় ১২০ মেগাওয়াট প্রয়োজন, কিন্তু পাচ্ছেন ১০০ মেগাওয়াট।

সুত্র: আগামীর সময়