ঢাকা ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৫০০ টাকার তেলের জন্য ঝড়-বৃষ্টিতে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা!

চেকপোস্ট ডেস্ক::
5

ঝড়ো ঠান্ডা হাওয়া, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো ভারী বৃষ্টি। সবকিছু উপেক্ষা করেই জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীর ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র ৫০০ টাকার তেল। এতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জ্বালানি তেলপ্রত্যাশীরা।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত আইডিয়াল ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং তেলপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের লাইন হাতিরঝিল পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সড়কের এক পাশে সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার। যান চলাচলের জন্য খোলা ছিল আরেকটি লেন, তবুও আশপাশের এলাকায় ধীরগতির যানজট তৈরি হয়েছিল।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই নামে বৃষ্টি। যাদের সঙ্গে রেইনকোট ছিল, তারা তা পরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আবার কেউ মোটরসাইকেল রেখে আশ্রয় নেন গাছের নিচে কিংবা ফুটপাতের চায়ের দোকানে। তবে অনেকেই কোনো আশ্রয় না পেয়ে ভিজতে ভিজতেই অপেক্ষা করেছেন।

সবকিছু উপেক্ষা করে তেলের আশায় চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় চালকদের। অপেক্ষার ফাঁকে ফাঁকে ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা মাইকে ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ‘তেল প্রায় শেষের দিকে। আপনারা কেউ বিশৃঙ্খলা করবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত তেল আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সরবরাহ চালিয়ে যাব।’

এমন ঘোষণায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। অনেকেই একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন—দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও যদি তেল না পাওয়া যায়, তাহলে সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে।

তেল পাওয়ার পর জাহিদ আহসান নামে এক মোটরসাইকেল চালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি সাড়ে ৮টার দিকে লাইনের একেবারে শেষ দিকে দাঁড়িয়েছিলাম। এর মধ্যে তিনবার ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজেছি। সবকিছু ভিজে গেছে, এমনকি শার্টও দুবার শুকিয়ে আবার ভিজেছে। শেষ পর্যন্ত প্রায় পৌনে ১১টার দিকে মাত্র ৫০০ টাকার তেল পেয়েছি। এই তেল না পেলে আজ বাইক ঠেলে বাসায় যেতে হতো।

রাইডশেয়ারিং চালক জাকির হোসেন বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৫০০ টাকার তেল লাগে। কিন্তু যেখানেই যাই, তেল নিতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগছে। ঢাকার সব পাম্পে তেল পাওয়া যায় না। যদি সব পাম্পে সরবরাহ থাকত, তাহলে এত বড় লাইন হতো না।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, তবুও সংশয় হচ্ছে—কাছাকাছি গিয়ে যদি শুনতে হয় তেল শেষ। আজ তেল না তুলতে পারলে কাল সকালে ট্রিপ শুরু করতে পারব না। সকালে আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে।

ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি থাকা প্রাইভেটকার চালক রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি হাতিরঝিলের ভেতর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন ধরে এখানে এসেছি। দুইটা পাম্প ঘুরে এখানে দাঁড়িয়েছি। হাজীপাড়া পাম্পে দেড় ঘণ্টা লাইনে থাকার পর জানানো হলো অকটেন শেষ। এখন দেখি এখানে পাই কি না।

এদিকে একই দিনে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রশ্নোত্তরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে।

তিনি জানান, এ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন আসবে। অকটেনের মজুত রয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টন, এপ্রিলের মধ্যে আরও ৭১ হাজার ৪৩৩ টন আসার কথা রয়েছে। পেট্রোলের মজুত আছে ১৬ হাজার টন, যার সঙ্গে আরও ৩৬ হাজার টন যুক্ত হবে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আরও বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশই হিমশিম খাচ্ছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে তেলের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা রেশনিং চালু করেছে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়েছে। ভারত, আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপালও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছে। তবে বাংলাদেশ এখনো জ্বালানির মূল্য স্বাভাবিক রেখেছে।

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ০৮:৫২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
৫০২ বার পড়া হয়েছে

৫০০ টাকার তেলের জন্য ঝড়-বৃষ্টিতে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা!

আপডেট সময় ০৮:৫২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
5

ঝড়ো ঠান্ডা হাওয়া, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো ভারী বৃষ্টি। সবকিছু উপেক্ষা করেই জ্বালানি তেলের জন্য রাজধানীর ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র ৫০০ টাকার তেল। এতে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জ্বালানি তেলপ্রত্যাশীরা।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত আইডিয়াল ফিলিং স্টেশন ঘুরে এবং তেলপ্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেলের লাইন হাতিরঝিল পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সড়কের এক পাশে সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার। যান চলাচলের জন্য খোলা ছিল আরেকটি লেন, তবুও আশপাশের এলাকায় ধীরগতির যানজট তৈরি হয়েছিল।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই নামে বৃষ্টি। যাদের সঙ্গে রেইনকোট ছিল, তারা তা পরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আবার কেউ মোটরসাইকেল রেখে আশ্রয় নেন গাছের নিচে কিংবা ফুটপাতের চায়ের দোকানে। তবে অনেকেই কোনো আশ্রয় না পেয়ে ভিজতে ভিজতেই অপেক্ষা করেছেন।

সবকিছু উপেক্ষা করে তেলের আশায় চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় চালকদের। অপেক্ষার ফাঁকে ফাঁকে ফিলিং স্টেশনের কর্মীরা মাইকে ঘোষণা দিচ্ছিলেন, ‘তেল প্রায় শেষের দিকে। আপনারা কেউ বিশৃঙ্খলা করবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত তেল আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সরবরাহ চালিয়ে যাব।’

এমন ঘোষণায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। অনেকেই একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন—দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও যদি তেল না পাওয়া যায়, তাহলে সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে।

তেল পাওয়ার পর জাহিদ আহসান নামে এক মোটরসাইকেল চালক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি সাড়ে ৮টার দিকে লাইনের একেবারে শেষ দিকে দাঁড়িয়েছিলাম। এর মধ্যে তিনবার ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজেছি। সবকিছু ভিজে গেছে, এমনকি শার্টও দুবার শুকিয়ে আবার ভিজেছে। শেষ পর্যন্ত প্রায় পৌনে ১১টার দিকে মাত্র ৫০০ টাকার তেল পেয়েছি। এই তেল না পেলে আজ বাইক ঠেলে বাসায় যেতে হতো।

রাইডশেয়ারিং চালক জাকির হোসেন বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৫০০ টাকার তেল লাগে। কিন্তু যেখানেই যাই, তেল নিতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগছে। ঢাকার সব পাম্পে তেল পাওয়া যায় না। যদি সব পাম্পে সরবরাহ থাকত, তাহলে এত বড় লাইন হতো না।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, তবুও সংশয় হচ্ছে—কাছাকাছি গিয়ে যদি শুনতে হয় তেল শেষ। আজ তেল না তুলতে পারলে কাল সকালে ট্রিপ শুরু করতে পারব না। সকালে আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে।

ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি থাকা প্রাইভেটকার চালক রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি হাতিরঝিলের ভেতর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার লাইন ধরে এখানে এসেছি। দুইটা পাম্প ঘুরে এখানে দাঁড়িয়েছি। হাজীপাড়া পাম্পে দেড় ঘণ্টা লাইনে থাকার পর জানানো হলো অকটেন শেষ। এখন দেখি এখানে পাই কি না।

এদিকে একই দিনে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রশ্নোত্তরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে।

তিনি জানান, এ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন আসবে। অকটেনের মজুত রয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টন, এপ্রিলের মধ্যে আরও ৭১ হাজার ৪৩৩ টন আসার কথা রয়েছে। পেট্রোলের মজুত আছে ১৬ হাজার টন, যার সঙ্গে আরও ৩৬ হাজার টন যুক্ত হবে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আরও বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশই হিমশিম খাচ্ছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে তেলের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা রেশনিং চালু করেছে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়েছে। ভারত, আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপালও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছে। তবে বাংলাদেশ এখনো জ্বালানির মূল্য স্বাভাবিক রেখেছে।