ঢাকা ০৩:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কার কী ভূমিকা ছিল?

চেকপোস্ট ডেস্ক::
13

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে জড়িতদের নাম জানিয়েছেন গ্রেফতার ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ।

বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় একটি হত্যা মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হন ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে রিমান্ডে রয়েছেন।

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বাহিনীর সদর দপ্তরে উচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়। পরিকল্পনার ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। বৈঠকেই নির্ধারণ করা হয়, বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদে কে কোন ভূমিকা পালন করবে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখেন তৎকালীন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) একটি অংশ। তবে মাঠ পর্যায়ে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ও র‌্যাবকে। পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ভিডিও ধারণের দায়িত্বও দেওয়া হয় এক সেনা কর্মকর্তাকে। উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সরাসরি মনিটরিং করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত ও কলংকিত অধ্যায়। উচ্ছেদের আগে ঢাকা সেনানিবাসের ৬ নম্বর শহীদ মঈনুল রোডের বাড়িটিতে প্রায় ৩৮ বছর ধরে বসবাস করছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সরকার বাড়িটি খালেদা জিয়াকে লিজ দিয়েছিল। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ওই সময় প্রতিবাদে হরতালও পালিত হয়।

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সময় ডিজিএফআই’র কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন এক-এগারো সরকারের কুশীলব শেখ মামুন খালেদ। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক পদে বসায়। খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পুরো প্রক্রিয়া খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন সাবেক প্রভাবশালী এই সেনা কর্মকর্তা।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দারা তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন-সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কার কী ভূমিকা ছিল। জবাবে শেখ মামুন খালেদ বলেন, উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরসহ তৎকালীন সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ সেনা কর্মকর্তা বৈঠক করেন। সেখানেই সব পরিকল্পনা হয়। ওই বৈঠকে ব্রিফ করেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস)। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্ত্রীসহ ওই কর্মকর্তা দেশ ত্যাগ করতে চাইলে বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রাখে তৎকালীন ডিজিএফআই’র একটি অংশ। আগের দিন সন্ধ্যার ওই বৈঠকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় সেভাবেই সব কিছু বাস্তবায়ন হয় বলে জানান মামুন খালেদ।

খালেদা জিয়ার বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কোন কর্মকর্তা কী ভূমিকা রাখেন গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তা বিস্তারিত তুলে ধরেন শেখ মামুন খালেদ। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। পুরো অভিযানের ভিডিও ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘মু’ আদ্যাক্ষরের মেজর পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে। এছাড়া আইএসপিআর-এর পরিচালক পর্যায়ের একজনসহ ডিজিএফআই’র বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন-এমন দাবি করেন শেখ মামুন খালেদ।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলায় প্রথম দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে ফের ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে মামুন খালেদের।

এদিকে এক-এগারো সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী আরেক সেনা কর্মকর্তা ডিজিএফআই’র সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছেরও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একই হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক-এগারো সরকারের সময় বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্যাতন করার অভিযোগ আছে।

রিমান্ডে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আফজাল নাছের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এক-এগারো সরকারের সময় তার অপকর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। নাম প্রকাশ না করে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, আফজাল নাছের দাবি করেছেন তিনি ভিক্টিমাইজ হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। কিন্তু কেন চাকরি হারালেন তা তিনি আজও জানেন না। তিনি গোয়েন্দাদের বলেছেন, আর্থিক সংকটের জন্য চাকরি করেন, অপরাধী হলে তিনি দেশে থাকতেন না।

আফজাল নাছের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেন, এক-এগারোর সময়ে ডিজিএফআই’র পরিচালকের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশ পালন করেন তিনি।

এক-এগারো সরকারের আরেক কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও মানব পাচার আইনে রাজধানীর পল্টন থানায় করা মামলায় রিমান্ডে রয়েছেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা এক-এগারো সরকারের আমলে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারো সরকারের সময় বেশ কিছু শিল্প গ্রুপের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা নেন। ওই সময় ট্রুথ কমিশন গঠনের মাধ্যমে নানা অপকর্ম করেন। আমরা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছি।

মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে হওয়া মানব পাচারের মামলা নিয়ে তদন্ত চলছে; মামলাটির তদন্ত সময়সাপেক্ষ উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, তাকে আরও কয়েক দফায় রিমান্ডে আনা লাগতে পারে।

গ্রেফতার সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই এক-এগারোর সরকারের সময় বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও এখনো কোনো ভুক্তভোগী মামলা করেননি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ভুক্তভোগীরা মৌখিক অভিযোগ করলেও নানা বাস্তবতায় মামলা করতে রাজি হচ্ছেন না।

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১২:৫৫:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
৫০৩ বার পড়া হয়েছে

খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কার কী ভূমিকা ছিল?

আপডেট সময় ১২:৫৫:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
13

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে জড়িতদের নাম জানিয়েছেন গ্রেফতার ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ।

বিতর্কিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় একটি হত্যা মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হন ডিজিএফআই’র সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। তিনি বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে রিমান্ডে রয়েছেন।

প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় একটি বিশেষ বাহিনীর সদর দপ্তরে উচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়। পরিকল্পনার ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। বৈঠকেই নির্ধারণ করা হয়, বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদে কে কোন ভূমিকা পালন করবে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা রাখেন তৎকালীন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) একটি অংশ। তবে মাঠ পর্যায়ে মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ও র‌্যাবকে। পুরো উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ভিডিও ধারণের দায়িত্বও দেওয়া হয় এক সেনা কর্মকর্তাকে। উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সরাসরি মনিটরিং করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত ও কলংকিত অধ্যায়। উচ্ছেদের আগে ঢাকা সেনানিবাসের ৬ নম্বর শহীদ মঈনুল রোডের বাড়িটিতে প্রায় ৩৮ বছর ধরে বসবাস করছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সরকার বাড়িটি খালেদা জিয়াকে লিজ দিয়েছিল। বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ওই সময় প্রতিবাদে হরতালও পালিত হয়।

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের সময় ডিজিএফআই’র কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিআইবি) পরিচালক ছিলেন এক-এগারো সরকারের কুশীলব শেখ মামুন খালেদ। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক পদে বসায়। খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পুরো প্রক্রিয়া খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন সাবেক প্রভাবশালী এই সেনা কর্মকর্তা।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গোয়েন্দারা তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন-সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কার কী ভূমিকা ছিল। জবাবে শেখ মামুন খালেদ বলেন, উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন ডিজিএফআই’র মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরসহ তৎকালীন সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। ঘটনার আগের দিন সন্ধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ সেনা কর্মকর্তা বৈঠক করেন। সেখানেই সব পরিকল্পনা হয়। ওই বৈঠকে ব্রিফ করেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস)। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর স্ত্রীসহ ওই কর্মকর্তা দেশ ত্যাগ করতে চাইলে বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। উচ্ছেদ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রাখে তৎকালীন ডিজিএফআই’র একটি অংশ। আগের দিন সন্ধ্যার ওই বৈঠকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় সেভাবেই সব কিছু বাস্তবায়ন হয় বলে জানান মামুন খালেদ।

খালেদা জিয়ার বাড়ি থেকে উচ্ছেদে কোন কর্মকর্তা কী ভূমিকা রাখেন গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে তা বিস্তারিত তুলে ধরেন শেখ মামুন খালেদ। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন বিতর্কিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। পুরো অভিযানের ভিডিও ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘মু’ আদ্যাক্ষরের মেজর পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে। এছাড়া আইএসপিআর-এর পরিচালক পর্যায়ের একজনসহ ডিজিএফআই’র বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন-এমন দাবি করেন শেখ মামুন খালেদ।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের হত্যা মামলায় প্রথম দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করে ফের ছয় দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে মামুন খালেদের।

এদিকে এক-এগারো সরকারের সময় বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী আরেক সেনা কর্মকর্তা ডিজিএফআই’র সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছেরও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একই হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক-এগারো সরকারের সময় বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্যাতন করার অভিযোগ আছে।

রিমান্ডে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আফজাল নাছের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এক-এগারো সরকারের সময় তার অপকর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। নাম প্রকাশ না করে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, আফজাল নাছের দাবি করেছেন তিনি ভিক্টিমাইজ হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। কিন্তু কেন চাকরি হারালেন তা তিনি আজও জানেন না। তিনি গোয়েন্দাদের বলেছেন, আর্থিক সংকটের জন্য চাকরি করেন, অপরাধী হলে তিনি দেশে থাকতেন না।

আফজাল নাছের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেন, এক-এগারোর সময়ে ডিজিএফআই’র পরিচালকের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশ পালন করেন তিনি।

এক-এগারো সরকারের আরেক কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও মানব পাচার আইনে রাজধানীর পল্টন থানায় করা মামলায় রিমান্ডে রয়েছেন। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা এক-এগারো সরকারের আমলে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এক-এগারো সরকারের সময় বেশ কিছু শিল্প গ্রুপের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা নেন। ওই সময় ট্রুথ কমিশন গঠনের মাধ্যমে নানা অপকর্ম করেন। আমরা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছি।

মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে হওয়া মানব পাচারের মামলা নিয়ে তদন্ত চলছে; মামলাটির তদন্ত সময়সাপেক্ষ উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, তাকে আরও কয়েক দফায় রিমান্ডে আনা লাগতে পারে।

গ্রেফতার সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই এক-এগারোর সরকারের সময় বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও এখনো কোনো ভুক্তভোগী মামলা করেননি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ভুক্তভোগীরা মৌখিক অভিযোগ করলেও নানা বাস্তবতায় মামলা করতে রাজি হচ্ছেন না।