ঢাকা ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন অর্থমন্ত্রীর বড় চ্যালেঞ্জ মেগা প্রকল্পের ঋণের বোঝা

চেকপোস্ট ডেস্ক::
95

গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে যে অগ্রগতি দেখা গেছে, তার বড় অংশ হয়েছে বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে। পদ্মা রেলসংযোগ, কক্সবাজার রেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলসহ আরো ৮–১০টি বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে লাখ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু উন্নয়নের এ রূপান্তরের আড়ালে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ।

গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে প্রকৃত কিস্তি পরিশোধ, সুদ সমন্বয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় বড় অঙ্কের আর্থিক দায়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে এ প্রকল্পগুলো চালুর সঙ্গে সঙ্গে ঋণ পরিশোধ সামাল দেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরেই অনেক প্রকল্পের কিস্তির অঙ্ক দ্বিগুণের মতো বাড়তে পারে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়তে থাকলে বাজেট সংকোচন, ছোট প্রকল্প স্থগিত এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার সংকুচিত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়বে এবং কোনো প্রকল্পের কিস্তি শোধ না হলে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের ডেট-ট্র্যাপ তৈরি হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়-স্ফীতি অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় অনুমানের তুলনায় ৩০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ২০১৬ সালে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যার বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে।

পদ্মা রেল প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২০১৮ সালে হওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এর ফলে একই বছর থেকে ২০ বছরের রিপেমেন্ট শুরু হয়েছে, যা ২০৪৪ পর্যন্ত চলবে। এ ঋণে সুদ ধরা হয়েছে ২ শতাংশ এবং সার্ভিস চার্জ শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, যা এখন প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের ঘাটতির কারণে পুরোপুরি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

মেট্রোরেল লাইন-৬-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষ করা যায়। ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ছিল ২১ হাজার কোটি টাকার আশপাশে। নকশা পরিবর্তন, রুট সম্প্রসারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং রেল প্রকৌশল ব্যয় বাড়ায় প্রকল্পটির খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মেট্রোরেলের যাত্রী থেকে আয়ের বড় অংশই পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধ করার মতো সঞ্চয় নেই। সরকারের বাজেট থেকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

প্রকল্পটি জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে বাস্তবায়িত হয়, যার ঋণচুক্তির সময়কাল ২০২৩ সালে শেষ ধাপে সম্পন্ন হয়। মেট্রোরেলের জন্য জাইকা যে অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) লোন দিয়েছে, তার মোট পরিশোধকাল ৩০ বছর, যা ২০৬১-৬২ অর্থবছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ লোন সম্পূর্ণভাবে ট্র্যাঞ্চভিত্তিক, অর্থাৎ ধাপে ধাপে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। প্রথমদিকে কিস্তির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম রাখা হয়েছে, যাতে প্রকল্প চালুর পর প্রাথমিক ব্যয়, পরিচালনা খরচ এবং রাজস্ব আয়ের সঙ্গে মিল রেখে সরকার সহজে ঋণ পরিশোধ শুরু করতে পারে। পরে ধীরে ধীরে কিস্তির পরিমাণ বাড়বে এবং পূর্ণ মেয়াদ শেষে মোট ঋণ শোধ হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড যুক্ত হওয়ার কারণে ব্যয় বেড়েছে। সময়মতো আয় না এলে এ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যয়-স্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতের যেকোনো মেগা প্রকল্পই দেশের অর্থনীতির ওপর ‘অকার্যকর বোঝা’ হয়ে দাঁড়াবে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানো হয়েছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০৪৮-৪৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের রিপেমেন্ট চলবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য বাজারমূল্যের নিচে নির্ধারিত হওয়ায় প্রকল্পটির আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ এখনো অসম্ভব। পুরো চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের এডিবি ঋণের রিপেমেন্ট ২০২২ থেকে শুরু হয়েছে। ২০ বছরব্যাপী রিপেমেন্ট চলবে ২০৪৮ পর্যন্ত। প্রথম বছরের বার্ষিক কিস্তি প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৮ পর্যন্ত বাড়বে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকায়। এ ঋণের সুদ প্রায় দুই শতাংশ আর প্রকল্পের নিজস্ব আয় দিয়ে সার্ভিসিং করা কঠিন। তাই সরকারকে বাজেটের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের জন্য গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর ২০২২–২৩ অর্থবছরেই রিপেমেন্ট শুরু হয়েছে। বার্ষিক প্রিন্সিপাল রিপেমেন্ট প্রায় ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন টাকা, সুদসহ সার্ভিসিং বর্তমানে চলছে। প্রকল্পটি অপারেশন লসে থাকায় সরকারকে বার্ষিক সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বাজেট ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু রিপেমেন্ট ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল। পদ্মা রেলের রিপেমেন্ট ২০২৪ থেকে শুরু হলেও রূপপুরের রিপেমেন্ট ২০২৮ থেকে শুরু হবে। ঋণের রিপেমেন্ট আলাদা সময় থেকে শুরু হওয়ায় এবং আলাদা মেয়াদি হওয়ায় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়বে।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার সব সময় বলে এসেছে, মেগা প্রকল্পগুলো নিজেই আয় করবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা তার বিপরীত। শুরুর দিকে কোনো প্রকল্পই পূর্ণ আয় করতে পারে না, বিশেষ করে বাংলাদেশে যেখানে ভাড়া সামাজিক মানদণ্ড ধরে নির্ধারিত হয়। পদ্মা রেল উদ্বোধনের পরও পূর্ণ যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। মেট্রোরেল প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ যাত্রী বহন করলেও পরিচালন ব্যয় খুব বেশি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মেট্রোরেল লাভজনক হতে অন্তত পাঁচ-ছয় লাখ যাত্রী প্রয়োজন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য বাজারমূল্যের নিচে থাকার কারণে আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পুরোনো লোকসানের ওপর নতুন খরচ যুক্ত হওয়ার কারণে ভর্তুকি বাড়ছে।

ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে মেট্রোরেল ও রেলের ভাড়া বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়। দীর্ঘমেয়াদে নতুন কর বা ভ্যাট বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়তে পারে। কারণ রাজস্ব সংগ্রহ না বাড়লে মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, যা ঋণ পরিশোধকে আরো কঠিন করছে।

মেগা প্রকল্পগুলো উন্নয়নের প্রতীক হলেও পরবর্তী পাঁচ-আট বছরে দেশের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে থাকবে। আয় বাড়তে আরো সময় লাগবে, কিন্তু ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। নতুন অর্থমন্ত্রীকে এখনই স্পষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। ঋণ পুনর্বিন্যাস, ভর্তুকি কমানো, প্রকল্প পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। নইলে আগামী কয়েক বছর দেশের অর্থনীতি চলবে একটি ‘টিকটিক করা টাইম বোমা’ নিয়ে।

অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সব বড় মেগা প্রকল্পের ঋণ চাপ আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হয়ে পড়বে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী কীভাবে এ বিশাল ঋণের বোঝা সামাল দেবেন, তা দেখার অপেক্ষায় আমরা সবাই। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করা, ভর্তুকি কমানো এবং প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করা। না হলে দেশের অর্থনীতি একটি টাইমবোমার মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

 

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ০৯:৪৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৫৫১ বার পড়া হয়েছে

নতুন অর্থমন্ত্রীর বড় চ্যালেঞ্জ মেগা প্রকল্পের ঋণের বোঝা

আপডেট সময় ০৯:৪৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
95

গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে যে অগ্রগতি দেখা গেছে, তার বড় অংশ হয়েছে বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে। পদ্মা রেলসংযোগ, কক্সবাজার রেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলসহ আরো ৮–১০টি বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে লাখ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু উন্নয়নের এ রূপান্তরের আড়ালে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ।

গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে প্রকৃত কিস্তি পরিশোধ, সুদ সমন্বয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় বড় অঙ্কের আর্থিক দায়। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে এ প্রকল্পগুলো চালুর সঙ্গে সঙ্গে ঋণ পরিশোধ সামাল দেওয়া।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরেই অনেক প্রকল্পের কিস্তির অঙ্ক দ্বিগুণের মতো বাড়তে পারে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়তে থাকলে বাজেট সংকোচন, ছোট প্রকল্প স্থগিত এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার সংকুচিত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়বে এবং কোনো প্রকল্পের কিস্তি শোধ না হলে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের ডেট-ট্র্যাপ তৈরি হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়-স্ফীতি অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় অনুমানের তুলনায় ৩০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

উদাহরণ হিসেবে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ২০১৬ সালে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার মতো ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রকৃত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যার বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে।

পদ্মা রেল প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২০১৮ সালে হওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এর ফলে একই বছর থেকে ২০ বছরের রিপেমেন্ট শুরু হয়েছে, যা ২০৪৪ পর্যন্ত চলবে। এ ঋণে সুদ ধরা হয়েছে ২ শতাংশ এবং সার্ভিস চার্জ শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, যা এখন প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের ঘাটতির কারণে পুরোপুরি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

মেট্রোরেল লাইন-৬-এর ক্ষেত্রেও একই চিত্র লক্ষ করা যায়। ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ছিল ২১ হাজার কোটি টাকার আশপাশে। নকশা পরিবর্তন, রুট সম্প্রসারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং রেল প্রকৌশল ব্যয় বাড়ায় প্রকল্পটির খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মেট্রোরেলের যাত্রী থেকে আয়ের বড় অংশই পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধ করার মতো সঞ্চয় নেই। সরকারের বাজেট থেকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

প্রকল্পটি জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে বাস্তবায়িত হয়, যার ঋণচুক্তির সময়কাল ২০২৩ সালে শেষ ধাপে সম্পন্ন হয়। মেট্রোরেলের জন্য জাইকা যে অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) লোন দিয়েছে, তার মোট পরিশোধকাল ৩০ বছর, যা ২০৬১-৬২ অর্থবছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ লোন সম্পূর্ণভাবে ট্র্যাঞ্চভিত্তিক, অর্থাৎ ধাপে ধাপে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। প্রথমদিকে কিস্তির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম রাখা হয়েছে, যাতে প্রকল্প চালুর পর প্রাথমিক ব্যয়, পরিচালনা খরচ এবং রাজস্ব আয়ের সঙ্গে মিল রেখে সরকার সহজে ঋণ পরিশোধ শুরু করতে পারে। পরে ধীরে ধীরে কিস্তির পরিমাণ বাড়বে এবং পূর্ণ মেয়াদ শেষে মোট ঋণ শোধ হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড যুক্ত হওয়ার কারণে ব্যয় বেড়েছে। সময়মতো আয় না এলে এ প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যয়-স্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতের যেকোনো মেগা প্রকল্পই দেশের অর্থনীতির ওপর ‘অকার্যকর বোঝা’ হয়ে দাঁড়াবে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড বাড়ানো হয়েছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০৪৮-৪৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের রিপেমেন্ট চলবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য বাজারমূল্যের নিচে নির্ধারিত হওয়ায় প্রকল্পটির আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ এখনো অসম্ভব। পুরো চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের এডিবি ঋণের রিপেমেন্ট ২০২২ থেকে শুরু হয়েছে। ২০ বছরব্যাপী রিপেমেন্ট চলবে ২০৪৮ পর্যন্ত। প্রথম বছরের বার্ষিক কিস্তি প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৮ পর্যন্ত বাড়বে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকায়। এ ঋণের সুদ প্রায় দুই শতাংশ আর প্রকল্পের নিজস্ব আয় দিয়ে সার্ভিসিং করা কঠিন। তাই সরকারকে বাজেটের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের জন্য গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর ২০২২–২৩ অর্থবছরেই রিপেমেন্ট শুরু হয়েছে। বার্ষিক প্রিন্সিপাল রিপেমেন্ট প্রায় ৪ দশমিক ০৫ বিলিয়ন টাকা, সুদসহ সার্ভিসিং বর্তমানে চলছে। প্রকল্পটি অপারেশন লসে থাকায় সরকারকে বার্ষিক সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বাজেট ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু রিপেমেন্ট ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল। পদ্মা রেলের রিপেমেন্ট ২০২৪ থেকে শুরু হলেও রূপপুরের রিপেমেন্ট ২০২৮ থেকে শুরু হবে। ঋণের রিপেমেন্ট আলাদা সময় থেকে শুরু হওয়ায় এবং আলাদা মেয়াদি হওয়ায় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়বে।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার সব সময় বলে এসেছে, মেগা প্রকল্পগুলো নিজেই আয় করবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা তার বিপরীত। শুরুর দিকে কোনো প্রকল্পই পূর্ণ আয় করতে পারে না, বিশেষ করে বাংলাদেশে যেখানে ভাড়া সামাজিক মানদণ্ড ধরে নির্ধারিত হয়। পদ্মা রেল উদ্বোধনের পরও পূর্ণ যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। মেট্রোরেল প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ যাত্রী বহন করলেও পরিচালন ব্যয় খুব বেশি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় মেট্রোরেল লাভজনক হতে অন্তত পাঁচ-ছয় লাখ যাত্রী প্রয়োজন।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য বাজারমূল্যের নিচে থাকার কারণে আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পুরোনো লোকসানের ওপর নতুন খরচ যুক্ত হওয়ার কারণে ভর্তুকি বাড়ছে।

ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে মেট্রোরেল ও রেলের ভাড়া বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়। দীর্ঘমেয়াদে নতুন কর বা ভ্যাট বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়তে পারে। কারণ রাজস্ব সংগ্রহ না বাড়লে মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, যা ঋণ পরিশোধকে আরো কঠিন করছে।

মেগা প্রকল্পগুলো উন্নয়নের প্রতীক হলেও পরবর্তী পাঁচ-আট বছরে দেশের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে থাকবে। আয় বাড়তে আরো সময় লাগবে, কিন্তু ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। নতুন অর্থমন্ত্রীকে এখনই স্পষ্ট পরিকল্পনা নিতে হবে। ঋণ পুনর্বিন্যাস, ভর্তুকি কমানো, প্রকল্প পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। নইলে আগামী কয়েক বছর দেশের অর্থনীতি চলবে একটি ‘টিকটিক করা টাইম বোমা’ নিয়ে।

অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সব বড় মেগা প্রকল্পের ঋণ চাপ আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হয়ে পড়বে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী কীভাবে এ বিশাল ঋণের বোঝা সামাল দেবেন, তা দেখার অপেক্ষায় আমরা সবাই। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করা, ভর্তুকি কমানো এবং প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করা। না হলে দেশের অর্থনীতি একটি টাইমবোমার মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।