পরাজয় হলেও জনসমর্থনে আলোচনার কেন্দ্রে আলেম প্রার্থী
হেরে গিয়েও জিতলেন মুফতি তাহেরী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর–চুনারুঘাট) আসনে আনুষ্ঠানিক ফলাফলে জয় না পেলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় বড় জায়গা করে নিয়েছেন ইসলামী ফ্রন্ট মনোনীত ও সুন্নীজোট সমর্থিত প্রার্থী মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত্ব তাহেরী। মোমবাতি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এই আলেম প্রার্থী পরাজিত হলেও বিপুল ভোটপ্রাপ্তি ও মাঠপর্যায়ের সাড়া তাঁকে অনেকের চোখে ‘নৈতিক বিজয়ী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই আসনে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী এস এম ফয়সল। যিনি হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট শিল্পপতি। ভোটযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ী হন এস এম ফয়সল। নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকে এস এম ফয়সল পেয়েছেন ১,৮৮,০৭২ ভোট। অন্যদিকে মোমবাতি প্রতীকে মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী পেয়েছেন ৮৪,৩২৩ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ১,০৩,৭৪৯ ভোট।
বিজয়ের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুফতি তাহেরীকে নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনা। একজন আলেম প্রার্থীকে ঘিরে যেমন সমর্থন ছিল, তেমনি ছিল প্রবল বিরোধিতা। অনেকেই মনে করছেন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৩১ দিনের প্রচারণায় অংশ নেন তাহেরী। রাজনৈতিকভাবে নবীন এই প্রার্থীকে স্বল্প সময়েই মোকাবিলা করতে হয়েছে তীব্র বিতর্ক, সমালোচনা ও গণমাধ্যমের নজরদারি। জাতীয় পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সবখানেই তাঁকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা হয়। অনেকের মতে, এ নির্বাচনে অন্য কোনো প্রার্থীকে ঘিরে এত বেশি বিতর্ক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এস এম ফয়সল ১৯৯১ সাল থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একজন পরিচিত মুখ। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হলেও রাজনীতির মাঠে তাঁর অভিজ্ঞতা তিন দশকের বেশি। ১৯৯১ থেকে ২০২৬ এই সময়কাল ধরলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ৩৫ বছরেরও অধিক। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তিনি প্রতিষ্ঠিত। মাধবপুর-চুনারুঘাট এলাকায় তাঁর একটি সুসংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে, যা বহু বছরের সম্পর্ক, সংগঠন ও উপস্থিতির ফল।
এর বিপরীতে, মুফতি তাহেরী এই এলাকায় কখনো নিয়মিত রাজনীতি করেননি, জনসাধারণের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কোনো সাংগঠনিক সম্পৃক্ততাও ছিল না। তাঁর বাড়িঘরও এই আসনে নয়। এমনকি এর আগে তিনি কখনো এখান থেকে নির্বাচনও করেননি। দলীয় সিদ্ধান্তে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তফসিল ঘোষণার পর তিনি মাঠে নামেন এবং মাত্র ৩১ দিনের প্রচারণা চালান, যেখানে তাঁকে পিছু ছাড়েনি বিতর্ক, সমালোচনা ও মিডিয়ার তীক্ষ্ণ নজর।
১৯৯১ সালে এস এম ফয়সল প্রথমবারের মতো বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৫১,৬৯৪ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এরপর তিনি আরও তিনবার নির্বাচন করেন এবং প্রতিবারই পরাজয়ের মুখে পড়েন। বিপরীতে, মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত্ব তাহেরী এই প্রথম চুনারুঘাট-মাধবপুর আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তবুও ফয়সাল সাহেবের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত কেন্দ্রগুলো থেকেও তাহেরী একেবারে শূন্য হাতে ফেরেননি, এসএম ফয়সলের শক্ত কেন্দ্রগুলো থেকেও তিনি ভোট তুলেছেন। এটাই বাস্তবতার বড় প্রমাণ।
এসএম ফয়সলের এই জয়কে বুঝতে হলে সময়ের পেছনে ফিরে তাকানো জরুরি। এই আসনের আগের নির্বাচনগুলো দেখলে ফয়সলের দীর্ঘ পথচলা স্পষ্ট হয়- ১৯৯১ সালে ৫ম সংসদ নির্বাচেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে এনামুল হক মোস্তফা শহীদ পান ৬৭,৮৪৭ ভোট, বিএনপির প্রার্থী হয়ে এস এম ফয়সল পান ৫১,৬৯৪ ভোট, ব্যবধান ১৬,১৫৩ ভোট। ১৯৯৬ সারে ৭ম সংসদ নির্বাচেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে এনামুল হক মোস্তফা শহীদ পান ৭০,২৪০ ভোট, বিএনপির প্রার্থী হয়ে এসএম ফয়সল পান ৫৯,৬৬৬, ব্যবধান ১০,৫৭৪ ভোট। ২০০১ সালে ৮ম সংসদ নির্বাচেনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে এনামুল হক মোস্তফা শহীদ পান ১,০৭,৩৭৬ ভোট, বিএনপির প্রার্থী হয়ে এসএম ফয়সল পান ৯৩,০৩১ ভোট, ব্যবধান ১৪,৩৪৫ ভোট। ২০০৮ সালে ৯ম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে এনামুল হক মোস্তফা শহীদ পান ১,৫৫,৮৯৬ ভোট, বিএনপির প্রার্থী হয়ে এসএম ফয়সল পান ১,২৪,৭৮৮ ভোট, ব্যবধান ৩১,১০৮ ভোট। চারবারের পরাজয় সত্ত্বেও ফয়সাল রাজনীতিতে ছিলেন সক্রিয়, এটাই তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তি ও ভোটব্যাংকের শক্তি।
এই বাস্তবতার মধ্যেও তাহেরী যে ৮৪ হাজার ৩শ ২৩ ভোট পেয়েছেন, সেটিই অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় ঘটনা। যেখানে দীর্ঘদিনের পরিচিতি নেই, নিজস্ব ভোটব্যাংক নেই, নেই স্থানীয় বসবাস, সেখানে মাত্র এক মাসের প্রচারণায় এত ভোট পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক ইতিহাস।
অনেকের দৃষ্টিতে, এই ফলাফলই তাহেরীর প্রকৃত বিজয়। কারণ রাজনীতিতে জয় শুধু আসন জয়ের নাম নয়; কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত সমর্থনই ভবিষ্যতের শক্ত ভিত তৈরি করে।
অনেকের মতে, তাহেরী যদি ছয় মাস আগে থেকেই মাঠে নেমে পরিকল্পিত প্রচারণা চালাতে পারতেন, তাহলে তাঁর ভোটের পরিমাণ কতটা বাড়ত, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি, সুযোগ না থাকায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তারা নির্বাচনে অংশ নিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার হিসাব-নিকাশ যে ভিন্ন রূপ নিত-এ কথাও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে ফল স্পষ্ট হলেও রাজনীতির হিসাব সবসময় কেবল অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। সীমিত সাংগঠনিক শক্তি ও প্রচলিত বড় জোটের বাইরে থেকেও তাহেরীর এই ভোটপ্রাপ্তি প্রমাণ করে তাঁর প্রতি এক বড় অংশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা রয়েছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক রাজনীতি ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। অনেক ভোটারের ভাষ্য, “আমরা জেনেশুনেই তাঁকে ভোট দিয়েছি। হার-জিত যাই হোক, তিনি আমাদের বিশ্বাসের প্রতীক।” এই মনোভাবই বলছে, হেরে গিয়েও তাহেরী আসলে জিতেছেন মানুষের হৃদয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি তিনি এই সমর্থনকে সংগঠিত রূপ দিতে পারেন, তাহলে হবিগঞ্জের রাজনীতিতে তাহেরী হয়ে উঠতে পারেন আরও শক্তিশালী এক নাম। কারণ, কিছু জয় থাকে ব্যালট বাক্সে, আর কিছু জয় থাকে মানুষের মনে। তাহেরীর ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিই যেন বেশি দৃশ্যমান। ফলাফলের কাগজে বিজয়ী এস এম ফয়সাল। কিন্তু রাজনীতির আরেকটি অদৃশ্য হিসাব আছে, জনমনে আলোড়ন, আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এবং সীমাবদ্ধতার মাঝেও সমর্থন আদায় করা। সেই বিচারে, মাধবপুর-চুনারুঘাটে বাড়িঘর না থাকা একজন নবীন প্রার্থীর ৮৪ হাজার ভোট পাওয়া নিছক পরাজয় নয়; এটি তাহেরীর জন্য এক ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক বিজয় বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
লেখক: শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
সম্পাদক ও প্রকাশক: চেকপোস্ট






















