ঢাকা ১০:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সংকট থেকে নেতৃত্বে উঠে আসার গল্প

খালেদা জিয়ার সাফল্য, সংগ্রাম ও কিছু রাজনৈতিক আক্ষেপ

স্টাফ রিপোর্টার::
129

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল এক অর্থে অপ্রত্যাশিত, আবার ইতিহাসের প্রয়োজনে অবধারিত। ১৯৮১ সালে স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর যে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়, সেই সংকটই একজন গৃহবধূ খালেদা জিয়াকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ছিলেন নিতান্তই সংসারী একজন নারী। সক্রিয় রাজনীতিতে জড়ানোর কোনো প্রস্তুতি বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ছিল, এমন প্রমাণ মেলে না। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি তাকে টেনে নেয় রাজনীতির ‘হাইওয়ে’তে।

সংকটকালে বিএনপির হাল ধরা

প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সেই সঙ্গে বিএনপিতে শুরু হয় কোন্দল, ভাঙন ও নেতৃত্বের সংকট। দলের অনেক শীর্ষ নেতা এরশাদের সঙ্গে আপস করলে বিএনপি কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে।

ছত্রভঙ্গ ও বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে দলের সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে রাজনীতিতে পা রাখেন খালেদা জিয়া। সেখান থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক যাত্রা।

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতা হয়ে ওঠা

বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে দল গড়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সেই দলকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলে রূপ দেন।”

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন খালেদা জিয়া। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন এবং বিএনপিও একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়।

১৯৯১: বিশ্বাসের ভোট ও প্রথম সরকার

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং রাজনীতিতে আসার এক দশকের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

তার প্রথম মেয়াদ (১৯৯১-৯৬) তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সময়ে দুর্নীতির বিস্তার সীমিত ছিল এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নারী নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত

আমেরিকার পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের শিক্ষক ড. সাঈদ ইফতেখার আহমেদের মতে, “একটি রক্ষণশীল সমাজে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া নারীর অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছেন। প্রচলিত সামাজিক বাধাগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।”

দ্বিতীয় মেয়াদ ও ‘ব্যাকফুটে’ যাওয়ার আক্ষেপ

তবে ২০০১-০৬ মেয়াদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়াকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ড. সাঈদ ইফতেখারের মতে, অতিমাত্রায় আপস ও মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ মনে করেন, ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মুখে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচন দিলে খালেদা জিয়া আরও শক্তিশালীভাবে ক্ষমতায় ফিরতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, “২০০১-০৬ মেয়াদে কিছু দুষ্টু লোক ক্ষমতার অংশ হয়ে এমন কাজ করেছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার ওপরই পড়েছে।”

দলীয় ভাঙন ও কঠিন সিদ্ধান্ত

এই সময়েই বিএনপির ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয় অনেক সিনিয়র নেতার সঙ্গে। রাষ্ট্রপতির পদ হারান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, দল ছাড়েন অলি আহমদের মতো নেতারা। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তারের আগে দলীয় মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াকেও বহিষ্কার করা হয়।

দমন-পীড়নের মাঝেও অটুট জনপ্রিয়তা

দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা, কারাবাস, হয়রানি ও পরিবারকে টার্গেট করা—সবই সহ্য করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। কিন্তু এসব তার জনপ্রিয়তায় আঁচ ফেলতে পারেনি। বরং কারাবন্দি অবস্থাতেও তার ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তারেক রহমানকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করেছেন এবং কঠিন সময়েও বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে সুদৃঢ় রেখেছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচনমুখী শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে—এর পেছনেও রয়েছে খালেদা জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক জীবনে কিছু ‘আক্ষেপ’ থাকলেও, দিনশেষে খালেদা জিয়া রয়ে যাবেন সাফল্য, সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে।

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১০:৩০:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
৫৮৫ বার পড়া হয়েছে

সংকট থেকে নেতৃত্বে উঠে আসার গল্প

খালেদা জিয়ার সাফল্য, সংগ্রাম ও কিছু রাজনৈতিক আক্ষেপ

আপডেট সময় ১০:৩০:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
129

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল এক অর্থে অপ্রত্যাশিত, আবার ইতিহাসের প্রয়োজনে অবধারিত। ১৯৮১ সালে স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর যে কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়, সেই সংকটই একজন গৃহবধূ খালেদা জিয়াকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ছিলেন নিতান্তই সংসারী একজন নারী। সক্রিয় রাজনীতিতে জড়ানোর কোনো প্রস্তুতি বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার ছিল, এমন প্রমাণ মেলে না। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতি তাকে টেনে নেয় রাজনীতির ‘হাইওয়ে’তে।

সংকটকালে বিএনপির হাল ধরা

প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সেই সঙ্গে বিএনপিতে শুরু হয় কোন্দল, ভাঙন ও নেতৃত্বের সংকট। দলের অনেক শীর্ষ নেতা এরশাদের সঙ্গে আপস করলে বিএনপি কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে।

ছত্রভঙ্গ ও বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে দলের সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে রাজনীতিতে পা রাখেন খালেদা জিয়া। সেখান থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক যাত্রা।

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতা হয়ে ওঠা

বিএনপি নিয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে দল গড়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সেই দলকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলে রূপ দেন।”

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন খালেদা জিয়া। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন এবং বিএনপিও একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে রূপ নেয়।

১৯৯১: বিশ্বাসের ভোট ও প্রথম সরকার

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং রাজনীতিতে আসার এক দশকের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

তার প্রথম মেয়াদ (১৯৯১-৯৬) তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সময়ে দুর্নীতির বিস্তার সীমিত ছিল এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নারী নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত

আমেরিকার পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেমের শিক্ষক ড. সাঈদ ইফতেখার আহমেদের মতে, “একটি রক্ষণশীল সমাজে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া নারীর অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছেন। প্রচলিত সামাজিক বাধাগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।”

দ্বিতীয় মেয়াদ ও ‘ব্যাকফুটে’ যাওয়ার আক্ষেপ

তবে ২০০১-০৬ মেয়াদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত খালেদা জিয়াকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ড. সাঈদ ইফতেখারের মতে, অতিমাত্রায় আপস ও মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ মনে করেন, ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মুখে সংসদ ভেঙে আগাম নির্বাচন দিলে খালেদা জিয়া আরও শক্তিশালীভাবে ক্ষমতায় ফিরতে পারতেন।

তিনি আরও বলেন, “২০০১-০৬ মেয়াদে কিছু দুষ্টু লোক ক্ষমতার অংশ হয়ে এমন কাজ করেছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার ওপরই পড়েছে।”

দলীয় ভাঙন ও কঠিন সিদ্ধান্ত

এই সময়েই বিএনপির ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয় অনেক সিনিয়র নেতার সঙ্গে। রাষ্ট্রপতির পদ হারান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, দল ছাড়েন অলি আহমদের মতো নেতারা। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তারের আগে দলীয় মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াকেও বহিষ্কার করা হয়।

দমন-পীড়নের মাঝেও অটুট জনপ্রিয়তা

দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা, কারাবাস, হয়রানি ও পরিবারকে টার্গেট করা—সবই সহ্য করতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। কিন্তু এসব তার জনপ্রিয়তায় আঁচ ফেলতে পারেনি। বরং কারাবন্দি অবস্থাতেও তার ক্যারিশমা ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।

তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তারেক রহমানকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করেছেন এবং কঠিন সময়েও বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে সুদৃঢ় রেখেছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি দ্রুত নির্বাচনমুখী শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পেরেছে—এর পেছনেও রয়েছে খালেদা জিয়ার দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী নেতৃত্ব।
রাজনৈতিক জীবনে কিছু ‘আক্ষেপ’ থাকলেও, দিনশেষে খালেদা জিয়া রয়ে যাবেন সাফল্য, সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে।