কালীগঞ্জে বিএনপির বিভক্ত রাজনীতি, ফিরোজ-হামিদ দ্বন্দ্ব ও রাশেদ খানের ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ
ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ): রাজনীতির ত্রিমুখী লড়াই ও রাশেদ খানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

যশোর বেল্টে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত ‘বেল্টুর আসন’ হিসেবে। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে টানা তিনটি এবং একচুয়ালি চারটি নির্বাচনে এখানে জয়লাভ করেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য শহীদুজ্জামান বেল্টু। তবে ২০০৮ সালে মাত্র চার হাজার ভোটের ব্যবধানে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যায় আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নানের কাছে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই আসনে আধিপত্য বজায় রাখেন আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী নেতা আনোয়ারুল আজীম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কালীগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দেয়। তবে দীর্ঘদিনের স্তব্ধতার কারণে সংগঠনের ভেতরে সৃষ্টি হয় বিভক্তি। অন্তত তিনটি শক্তিশালী গ্রুপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। একটির নেতৃত্বে আছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, অন্যটির নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হামিদুল ইসলাম হামিদ এবং তৃতীয় গ্রুপে রয়েছেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক এমপি বেল্টুর স্ত্রী মুরশিদা জামান।
এই তিন পক্ষের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয় ফিরোজ ও হামিদকে কেন্দ্র করে। ফিরোজ দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও হামিদ ছিলেন বেল্টুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও মাঠপর্যায়ের সংগঠক। এই দ্বন্দ্ব একপর্যায়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। দলীয় কোন্দলে হামিদের পক্ষের পাঁচজন কর্মী নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে। ফিরোজ পক্ষ দাবি করে, এসব মৃত্যু সামাজিক সহিংসতার ফল। পরিস্থিতির অবনতি হলে কেন্দ্র থেকে উপজেলা বিএনপি কমিটি বাতিল করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় কোনো আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব ছাড়াই চলে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির রাজনীতি।
এই জটিল বাস্তবতায় ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপি জোটসঙ্গী হিসেবে বিবেচনায় আনে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে। সে কারণে প্রথম ধাপে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পক্ষ থেকে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপিকে চিঠি দিয়ে রাশেদ খানকে সহযোগিতার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে আসনটি রাশেদের জন্য ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাও আসে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও ছিল। সংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা ফিরোজ যে এতে বাগড়া দেবেন, তা প্রায় নিশ্চিত ছিল। সেই আশঙ্কা থেকেই রাশেদ খান শেষ পর্যন্ত গণঅধিকার পরিষদ থেকে বের হয়ে সরাসরি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে কালীগঞ্জে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফিরোজপন্থী উপজেলা বিএনপির বড় একটি অংশ ও ছাত্রদল রাশেদ খানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে। তাকে উপজেলায় ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়, কাফনের কাপড় পরে মিছিল হয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণাও আসে।
তবে এখানেই ফিরোজ একটি বড় রাজনৈতিক ভুল করে বসেন। তিনি প্রকাশ্যে খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে আক্রমণ করেন। তরিকুল ইসলামের ছেলে হিসেবে অমিত খুলনা বিভাগে বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী অভিভাবক হিসেবে পরিচিত। ফিরোজের বক্তব্য—তারেক রহমানের নির্দেশ অমান্য ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ, অমিত সহজে মেনে নেবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে রাশেদ খানকে জেতাতে অমিত তার সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাশেদ খান দাবি করছেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান কালীগঞ্জে জনসভা করবেন—এই শর্তেই তিনি এই আসনের প্রার্থী হতে সম্মত হয়েছেন। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তার জন্য প্রস্তুতি ও সমর্থন আগেই নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী উপজেলা নায়েবে আমির মাওলানা আবু তালিব। সংগঠনিকভাবে তার টিম শক্তিশালী। তিনি সারা বছর ধরে উন্নয়ন ভাবনা ও নানামুখী কর্মসূচি সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক ভাষা ও পিআর কৌশল কিছুটা ব্যাকডেটেড হওয়ায় তরুণ ও ভাসমান ভোটারদের কাছে আরও আধুনিক উপস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসন এখন ত্রিমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু—বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রাশেদ খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জামায়াতের সংগঠিত উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে এই আসনের রাজনীতি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত।


























