সৈয়দপুরে ঈদের আনন্দ নাই একই পরিবারের ৭ প্রতিবন্ধির জীর্ণ ঘরে

আর মাত্র দুই দিন পর ঈদ। চারপাশে বিরাজ করছে উৎসব আমেজ। কেনাকাটাসহ নানা আয়োজনে ব্যস্ত সবাই। একইসাথে চলছে সাজানো গোছানোর কাজও। ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের মাঝে খুশির ছটা। কিন্তু এতো উচ্ছলতার মাঝেও একটি পরিবারে নেই ঈদ আনন্দের ছিটেফোঁটা।
ঈদের মত আনন্দ উৎসবের খুশি বঞ্চিত পরিবারটি হলো একইসাথে ৭ জন প্রতিবন্দিকে নিয়ে। যারা একদিকে যেমন প্রকৃতিগতভাবে অসহায়, তেমনি সমাজের সার্বিক সহযোগিতা থেকেও বঞ্চিত। ঈদ উপলক্ষে তাদের আশেপাশের অনেকে সরকারী নানা সুযোগ সুবিধা পেলেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি সেসবের কিছুই। যে কারণে তারা মুসলমান হয়েও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম উৎসবেও রয়েছেন একেবারে আনন্দবিহিন।
এমন চরম দুঃখ ভারাক্রান্ত দুস্থ পরিবারটির অবস্থান নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর পীরপাড়ায়। বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, সৈয়দপুর-বদরগঞ্জ সড়কে পীরপাড়া মোড়ের সাথেই অত্যন্ত জীর্নশীর্ণ টিনের চালের ছোট এক খুপরির মত ঘরে তাদের বসবাস।
এই বাড়ির মালিক মো. নজরুল ইসলাম। তিনি নিজে যেমন দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। তেমনি তার দুই ছেলে এক মেয়ে এবং দুই নাতিও দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। আর বিধবা ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধি নজরুল ইসলামের এক বড় বোনও দীর্ঘদিন থেকে এই সংসারে। ১০ সদস্যের পরিবারে একসাথেই তাদের মানবেতর জীবন যাপন।
মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জন্মগতভাবেই আমি দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। স্ত্রী ও এক ছেলের কোন সমস্যা না থাকলেও ২ ছেলে মাহাবুল (২৮) ও মহাসিন (২৫) এবং মেয়ে নাজিরা (২৩) জন্মের পর থেকেই একই সমস্যায় ভুগছে। ছেলের স্ত্রীরা ভালো হলেও মাহাবুলের ছেলে রহমতুল্লাহ (২) ও মহাসিনের ছেলে লিমনও (৩) দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত।
আরেক ছেলে মাজেদুলই (২০) একমাত্র এই রোগ থেকে মুক্ত। আর আমার বড় বোন সামসুন নাহারও জন্মগতভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। তিনিও দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর যাবত বিধবা হয়ে আমার সংসারেই। সবাইকে নিয়ে চরম দুরাবস্থার মধ্যে দিন কাটে আমাদের।
নজরুলের ছেলে মাহাবুল বলেন, পুরো পরিবারে মাত্র একটি প্রতিবন্ধি কার্ড পেয়েছি আমরা। সেই ভাতা দিয়ে অনেক কষ্টে আমাদের সংসার চলে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধি হওয়ায় আমরা কোন কাজ করতে পারিনা। আমার বাবা ও মায়ের বয়স্ক ভাতা কার্ড ও আমাদের ভাইবোনদের প্রতিবন্ধি ভাতা কার্ডসহ সরকারী সহযোগিতার বিভিন্ন সামাজিক ভাতার কার্ড করে দেয়ার জন্য চেয়ারম্যান মেম্বারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন কাজ হয়নি। কার্ড করে দেয়ার জন্য তারা টাকা চায়। কিন্তু আমরা টাকা পাবো কোথায়। তাই বছরের পর বছর ধরে সব ধরণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত আমরা।
নাজিরা খাতুন বলেন, ঈদ উপলক্ষে স্থানীয় মেম্বার মাত্র ১টি ভিজিপি কার্ড দিয়েছেন। তা দিয়ে মাত্র ১০ কেজি চাল পাওয়া গেছে। আমাদের ১০ সদস্যের পরিবারের জন্য যা খুবই অপ্রতুল। আর কোন সুযোগ সুবিধা আমরা বিশেষ উৎসব উপলক্ষে পাইনা। অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। অথচ আমাদের আশে পাশেরই অনেক স্বচ্ছল পরিবারও ঈদে ভিজিপির চাল, শুকনা খাবারের প্যাকেজ, নগদ টাকা শাড়ি-লুঙ্গিসহ বিভিন্ন সামগ্রী উপহার পাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কাছ থেকে।
যাদের মধ্যে ছাদ পিটানো পাকা বাড়ি, মোটর সাইকেল ও বহু জমিজমাসহ সম্পদের মালিকরাও আছেন। তার উপর উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলার কামারপুকুরে একজন বিত্তশালী শিল্পপতি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে অনুদান প্রদান করলেও আমাদের মত হতদরিদ্র পরিবারের দিকে ফিরেও তাকাননি। এসব দেখে আর বেঁচে থাকার ইচ্ছে হয়না।
নজরুল ইসলামের ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা আব্দুল মান্নানের দুই জন স্ত্রী ছিলেন। নজরুল ইসলাম ও তার বড় বোন সামসুন নাহার প্রথম স্ত্রী জমিলার সন্তান। আর আমরা ৩ ভাই বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনার সন্তান। নজরুল ইসলাম ও সামসুন নাহার ছোট বেলা থেকেই প্রতিবন্ধি। তার সন্তানরা ও নাতিরাও দৃষ্টি প্রতিবন্ধি হয়েছে। জন্মগতভাবে এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার পুরো পরিবারটি। দুরাবস্থা অনুযায়ী তারা সরকারী সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না। এমনকি যে ঘরে বাস করেন তার অবস্থাও নাজুক। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তারা। তাদের জন্য সরকারী সবধরণের ভাতা ও সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা খুবই প্রয়োজন।
নজরুল ইসলামের পরিবার তাই এ ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এবং সদ্য নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা যেন সার্বিক দিক বিবেচনা করে এই দরিদ্র অসহায় প্রতিবন্ধি পরিবারটির প্রতি সুনজর রাখেন এবং প্রয়োজনীয় সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে তাদের জীবন মান উন্নয়নে ভুমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে নজরুল ইসলামের ছেলেদের মোটা অংকের অর্থ সাহায্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেওয়ার দাবিই বিশেষভাবে ব্যক্ত করেছেন তারা।
এব্যাপারে সৈয়দপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল মাবুদ জানান, এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ৩৮ হাজার ৪১৯ জনকে ভিজিএফ এর চাল, ১৯২ জনকে শুকনো খাবারের প্যাকেজ, নগদ ৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিবন্ধি পরিবারটির তথ্য জানা ছিলনা তাই তাদের কোন সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আপনার মাধ্যমে জানতে পেরে আমরা খোঁজ নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহা ফাতেহা তাকমিলা বলেন, এমন একটি পরিবার সরকারী সুবিধা বঞ্চিত রয়ে গেছে এমন কোন তথ্য আমার জানা ছিলনা। তবে যেহেতু তারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধি সেহেতু তারা অবশ্যই সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিবন্ধি ভাতা পান। সেকারণে তাদের তথ্য সমাজ সেবা অফিসারের কাছে থাকার কথা। তারা কেন এ ব্যাপারে সুনজন রাখলেন না তা খতিয়ে দেখা হবে এবং দ্রুত পরিবারটির কষ্ট লাঘবে সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। সম্ভাব্য সকল সুযোগ সুবিধা প্রদানে পদক্ষেপ নিবো।
নীলফামারী-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম বলেন, এমন একটি সংবেদশীল তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানাই। দরিদ্র ও প্রতিবন্ধি পরিবারটির জন্য আমার সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করবো এবং সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিবো। সেই সাথে ইতোপূর্বে কেন তারা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন সে বিষয়েও জবাবদিহিতার চেষ্টা করবো।
























