ঢাকা ০১:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিদেশবাসী হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটি নাম প্রবাসী

শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার::

ছবি: চেকপোস্ট

নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে বসবাস করাই হলো প্রবাস। বাংলাদেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী প্রবাসে বসবাস করে। প্রবাস মানে বিদেশ বা দূরদেশ, প্রবাস মানে আত্মীয়স্বজনবিহীন বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে দেয়া, প্রবাস মানে দেয়ালবিহীন কারাগার, প্রবাস মানে শত দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে বিরামহীন জীবনযুদ্ধ করা।

প্রবাস জীবন শুধু একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়, এটি আবেগ, ত্যাগ, এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর এক গভীর গল্প। যারা দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি দেয়, তাদের জন্য এই যাত্রা যতটা স্বপ্নপূরণের, ততটাই কষ্টের। এটি আমাদের লক্ষ রেমিটেন্স যোদ্ধাদের বাস্তবতা।

প্রবাসীদের জীবনে নানা রকম আবেগ মিশে থাকে—দেশের জন্য টান, প্রিয়জনদের জন্য মায়া এবং নিজের শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবিকার তাগিদে কারো ছেলে, কারো ভাই, কারো বাবা, কারো স্বামী অন্যের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশান্তরী হয়। এই বিদেশবাসী বা দেশান্তরিত হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটি নাম প্রবাসী।

প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ প্রবাসী। এই এক কোটির সাথে পরিবারের ৫ জন করে সদস্য ধরলে প্রায় ৬ কোটি মানুষের ভাগ্য এর সাথে জড়িত।

প্রবাসীরা মাসিক যে বেতন পায়, তার এক-তৃতীয়াংশ নিজের রুম ভাড়া, খাওয়া, মোবাইল ও অন্যান্য খরচে চলে যায়। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়, যা ঘর খরচ, ছেলে-মেয়ের স্কুলের খরচ, ভাই-বোনের বিবাহ, মা-বাবার চিকিৎসা খরচ ও সহধর্মিনীর হাত খরচে ব্যয় হয়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তারা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। তবে অনেকের ভাগ্যে ঠিকমতো বেতন জোটে না, কখনো ৪-৫ মাস পর্যন্ত বেতন বাকি থাকে। তখন তারা ধার-কর্জ করে প্রিয়জনের সুখের জন্য টাকা পাঠায়, কিন্তু নিজের দুঃখ কাউকে বুঝতে দেয় না। তারা নিরাশার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে হাসিমুখে বলে—’মা, আমি ভালো আছি’, ‘বাবা, আমি ভালো আছি’। প্রতিটি টাকা খরচ করতে তাদের দুইবার ভাবতে হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারীরা তাদের উৎপাদিত দ্রব্যাদি রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের সময় সরকারের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করে। প্রশ্ন হলো, তাদের উৎপাদিত দ্রব্যাদির লভ্যাংশ কোথায় যায়? এখানেই বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রবাসীদের পার্থক্য। ফ্যাক্টরির মালিকেরা ‘কৈ-এর তেল দিয়ে কৈ ভাজে’, কিন্তু প্রবাসীদের সে সুযোগ নেই।

সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা ও মা-বাবার দোয়ায় প্রবাসীরা অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায়। প্রতিটি প্রবাসী একেকজন জীবনযুদ্ধের সৈনিক। তারা না হেসেও অন্যের হাসি দেখতে ভালোবাসে। কেউ না খেয়েও অন্যকে খাওয়ানোর চেষ্টা চালায়। কেউ আবার অন্যের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেয়। প্রবাসীরা নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি এবং মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ০৫:৫৫:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫
৫২৩ বার পড়া হয়েছে

বিদেশবাসী হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটি নাম প্রবাসী

আপডেট সময় ০৫:৫৫:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫

নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে বসবাস করাই হলো প্রবাস। বাংলাদেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী প্রবাসে বসবাস করে। প্রবাস মানে বিদেশ বা দূরদেশ, প্রবাস মানে আত্মীয়স্বজনবিহীন বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে দেয়া, প্রবাস মানে দেয়ালবিহীন কারাগার, প্রবাস মানে শত দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে বিরামহীন জীবনযুদ্ধ করা।

প্রবাস জীবন শুধু একটি ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়, এটি আবেগ, ত্যাগ, এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর এক গভীর গল্প। যারা দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি দেয়, তাদের জন্য এই যাত্রা যতটা স্বপ্নপূরণের, ততটাই কষ্টের। এটি আমাদের লক্ষ রেমিটেন্স যোদ্ধাদের বাস্তবতা।

প্রবাসীদের জীবনে নানা রকম আবেগ মিশে থাকে—দেশের জন্য টান, প্রিয়জনদের জন্য মায়া এবং নিজের শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবিকার তাগিদে কারো ছেলে, কারো ভাই, কারো বাবা, কারো স্বামী অন্যের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশান্তরী হয়। এই বিদেশবাসী বা দেশান্তরিত হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটি নাম প্রবাসী।

প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিটেন্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ প্রবাসী। এই এক কোটির সাথে পরিবারের ৫ জন করে সদস্য ধরলে প্রায় ৬ কোটি মানুষের ভাগ্য এর সাথে জড়িত।

প্রবাসীরা মাসিক যে বেতন পায়, তার এক-তৃতীয়াংশ নিজের রুম ভাড়া, খাওয়া, মোবাইল ও অন্যান্য খরচে চলে যায়। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়, যা ঘর খরচ, ছেলে-মেয়ের স্কুলের খরচ, ভাই-বোনের বিবাহ, মা-বাবার চিকিৎসা খরচ ও সহধর্মিনীর হাত খরচে ব্যয় হয়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তারা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। তবে অনেকের ভাগ্যে ঠিকমতো বেতন জোটে না, কখনো ৪-৫ মাস পর্যন্ত বেতন বাকি থাকে। তখন তারা ধার-কর্জ করে প্রিয়জনের সুখের জন্য টাকা পাঠায়, কিন্তু নিজের দুঃখ কাউকে বুঝতে দেয় না। তারা নিরাশার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে হাসিমুখে বলে—’মা, আমি ভালো আছি’, ‘বাবা, আমি ভালো আছি’। প্রতিটি টাকা খরচ করতে তাদের দুইবার ভাবতে হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারীরা তাদের উৎপাদিত দ্রব্যাদি রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের সময় সরকারের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করে। প্রশ্ন হলো, তাদের উৎপাদিত দ্রব্যাদির লভ্যাংশ কোথায় যায়? এখানেই বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রবাসীদের পার্থক্য। ফ্যাক্টরির মালিকেরা ‘কৈ-এর তেল দিয়ে কৈ ভাজে’, কিন্তু প্রবাসীদের সে সুযোগ নেই।

সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা ও মা-বাবার দোয়ায় প্রবাসীরা অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায়। প্রতিটি প্রবাসী একেকজন জীবনযুদ্ধের সৈনিক। তারা না হেসেও অন্যের হাসি দেখতে ভালোবাসে। কেউ না খেয়েও অন্যকে খাওয়ানোর চেষ্টা চালায়। কেউ আবার অন্যের সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেয়। প্রবাসীরা নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি এবং মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 


Notice: ob_end_flush(): failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home2/checkpostcom/public_html/wp-includes/functions.php on line 5464