বাগেরহাটের রামপালে মডেল কেয়ারটেকার আল মামুনের ১২ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ;প্রতিকারে বিভিন্ন দপ্তরে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ

বাগেরহাটের রামপালে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের মডেল কেয়ারটেকার মো. আল মামুনের বিরুদ্ধে দূর্নীতি ও ঘুষ নেওয়ার বিস্তার অভিযোগ উঠেছে। বিগত সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি এসব অপকর্ম করে আসছেন।সরকার পরিবর্তন হলেও এতসব দূর্নীতি করে বহল তবিয়তে রয়েছেন এই কেয়ারটেকার।
জানা গেছে, কেয়ারটেকার আল মামুন ইসলামী ফাউন্ডেশনের অধীনে চাকুরীতে যোগদান করেই জড়িয়ে পড়েন দূর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই কেয়ারটেকার মামুন মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে নিতেন মোটা অংকের টাকাও। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের ছেলে সেজে তার ছত্রছায়ায় তিনি করেছেন সীমাহীন দূর্নীতি। চাকুরি বাঁচাতে মুখ খুলতে পারেননি কেউই। আল মামুনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও গেলো ৯ বছরে আলোর মূখ দেখেনি আবেদনগুলো। সব বাঁধা পেরিয়ে তিনি রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদ ভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের ৮ম পর্যায়ের কর্মসূচির আওতায় রামপালে মোট ৭৬ টি কেন্দ্র চলমান রয়েছে। ওইসব কেন্দ্রে শিশুদের পাঠদানের পাশাপাশি দেওয়া হয় ইসলামিক শিক্ষা। প্রতিদিন ভোর থেকেই কেন্দ্রগুলোতে বইখাতা নিয়ে হাজির হয় শিশুরা। সেখানে সামাজিক মূল্যবোধ, আচরন, নীতিনৈতিকতার পাশাপাশি দেওয়া হয় স্বাস্থ্য সচেতনামূলক জ্ঞান। চলমান ওই কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত রয়েছেন একজন করে শিক্ষক। এসব কেন্দ্রগুলোর দেখভাল ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন মডেল কেয়ারটেকার আল মামুন। এরপর থেকেই তিনি শুরু করেন স্বেচ্ছাচারিতা। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপজেলার বিভিন্ন নেতাদের সাথে আল মামুনের সখ্যতা থাকায় করেছেন সীমাহীন দূর্নীতিও। চাকুরি বাঁচাতে তখন মুখ খুলতে পারেনি ভুক্তভোগী শিক্ষকবৃন্দের কেউই।
২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উপজেলার বড়কাটালী শেখ পাড়া মহিলা মক্তব কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে মোসম্মৎ হাওয়া ইয়াসমিনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ৪৫ হাজার টাকা। এভাবে ফজলুর রহমানের কাছ থেকে নেয় ৩০ হাজার টাকা, শহিদুল ফকিরের কাছ থেকে নেয় ৫০ হাজার, রকিবুল ইসলামের কাছ থেকে নেয় ৪০ হাজার টাকা, আবু জাফরের কাছ থেকে নেয় ৪৫ হাজার টাকা, আফতাব হাওলাদারের কাছ থেকে নেয় ৪০ হাজার টাকা। এভাবে অসংখ্য শিক্ষকদের কাছ থেকে কেন্দ্র পরিদর্শন, কেন্দ্র পরিদর্শনের মোটরসাইকেল তেলক্রয়, চাকুরী দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের চাকুরি থেকে বহিষ্কার, বাৎসরিক ঘুষ, ঈদ বোনাসসহ বিভিন্ন অজুহাতে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৫ লক্ষ টাকা। এর আগেও ভুক্তভোগী শিক্ষকগণ আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ধর্ম মন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেখানে ভুক্তভোগী শিক্ষকবৃন্দ উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা যাওয়া আসা ও খাওয়া বাবাদ ৬৩ কেন্দ্র থেকে ২ হাজার ৪ শত টাকা করে মোট ১ লক্ষ ৫১ হাজার ২ শত টাকা করে হাতিয়ে নেয়। ওই সম্মেলনে যাওয়া আসার জন্য ৬০ হাজার ৫ শত টাকায় বাস ভাড়া করেন একটি। বাকি ৯০ হাজার ৭ শত টাকা আত্মসাত করেন তিনি। অথচ ওই সম্মেলনে দেওয়া হয়নি কোনো খাবারও। ২০১৭ সালে নভেম্বরে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীদের অনলাইনে ভর্তির ইস্যু দেখিয়ে ১৪০০ টাকা করে ৬৩ কেন্দ্র থেকে হাতিয়ে নেন ৮৮ হাজার ২ শত টাকা। ২০১৮ সালে ১২ টি নতুন কেন্দ্রে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেক শিক্ষকদের কাছ থেকে ২০ হাজার করে মোট ২ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এছাড়াও বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে আরো নেয় ১৫ হাজার টাকা। এভাবে সর্বমোট প্রায় ১২ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছে অভিযুক্ত আল মামুন।
ওইসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষকবৃন্দ প্রতিকার চেয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয় প্রকল্প পরিচালক ও বাগেরহাটের উপ-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গভীর তদন্ত শুরু করেন এবং আল মামুনের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতসহ স্বেরাচারীতার সত্যতা পান। ওই ঘটনায় আল মামুনকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় বাগেরহাটের উপ পরিচালক আল- ফারুক ২০১৯ সালে আল মামুনকে মডেল কেয়ারটেকারের সকল কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যহতি প্রদান করেন এবং পূণরায় চিহ্নিত ১৬ টি অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জবাব দিতে নির্দেশ দেন। অবশেষে আত্মপক্ষ সমর্থনের নিমিত্তে মানবিক বিবেচনায় প্রথমবারের মতো ক্ষমা প্রার্থনা করে দেড়শত টাকা স্টাম্পে একটি মুসলেকা দেন অভিযুক্ত আল মামুন।
অভিযোগ উঠেছে কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই আল মামুন আবার শুরু করেছে দূর্নীতি। দিচ্ছে অভিযোগকারী শিক্ষকদের বিভিন্ন ভয়ভীতি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক শিক্ষক জানান, রামপাল মডেল কেয়ারটেকার সুপারভাইজার আব্দুল হাদি আকুনজি’র নেপথ্যে আল মামুন করে যাচ্ছেন একের পর এক অপকর্ম। ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারায় রয়েছে তার অংশীদারিত্ব। এছাড়াও আল মামুনের আরেক সহযোগী খালিদ হোসেনসহ কয়েক জন শিক্ষক তাকে বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।
এবিষয়ে অভিযুক্ত আল মামুন বলেন, আমার বিরুদ্ধে তারা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে মুসলেকা কেনো দিলেন এবিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেনি।
অভিযোগের বিষয়ে বাগেরহাট ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ পরিচালক এবিএম গোলাম সরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু অভিযোগের বিষয়ে আল মামুনের বিরুদ্ধে সত্যতা পাওয়া গেছে, সেক্ষেত্রে ফাউন্ডেশনের নিয়মঅনুযায়ী তার চাকুরি থাকার কথা না। কিন্তু কি কারণে এখনও তিনি কর্মস্থলে আছেন এটা কর্তৃপক্ষই বলতে পারবেন। বেশি কিছু বললে আমার আবার চাকরি থাকবে না।






















