ঢাকা ১২:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নগরবাসীর জন্য ১৭০ ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ স্থাপন করবে সরকার

চেকপোস্ট ডেস্ক::
10

গ্রামাঞ্চলের মতো শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অসুস্থ হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় শহরের মানুষকে এখনও ভরসা করতে হয় বেসরকারি হাসপাতালের ওপর; যা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল। এই বাস্তবতার বদল আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

২০২৮ সালের মাঝামাঝি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শহরের মানুষের জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বড় একটি প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে স্থাপন করা হবে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘নগরবাসীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় অনুমোদন পেতে যাচ্ছে আলোচ্য প্রকল্পটি। একনেক সভার কার্যতালিকায় না থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে সরাসরি একনেক সভার টেবিলে উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

নগরবাসীর জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ২০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর বাকি ৯৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে, যার বেশির ভাগ দেবে বিশ্বব্যাংক। একনেকে অনুমোদন পেলে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শহরের মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার স্থাপন করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে হেলথ সেন্টারগুলো স্থাপন করা হবে। হেলথ সেন্টারগুলো হবে শহরের মানুষদের নিকটতম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে সেবার সময়সূচিতে। আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় স্থাপনা করা প্রতিটি কেন্দ্র দুই শিফটে চালু থাকবে। অর্থাৎ সকাল ও বিকেল মানুষ চিকিৎসা নিতে পারবেন। দুই শিফটে চালু থাকায় যারা দিনভর কাজ করেন, তারা সন্ধ্যার দিকে এসেও চিকিৎসা নিতে পারবেন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি নগর স্বাস্থ্য নীড়ে দুই শিফটে সেবা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মানবসম্পদ নিয়োগ করা হবে, যা নগর স্বাস্থ্যসেবায় বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত হলেও শহরাঞ্চলে তেমন কোনো সমমানের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অসুস্থ হলে শহরের মানুষকে এখনো ভরসা করতে হয় সীমিত সরকারি সেবা কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের ওপর। এ ছাড়া সরকারি আউটডোর ও টারশিয়ারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা সাধারণত শুধু সকালে পাওয়া যায়। ফলে কর্মজীবী মানুষ, গৃহিণী বা দিনমজুরদের জন্য চিকিৎসা নেওয়া অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বদলাতেই নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায়। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাও যুক্ত করা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের (ডিএইচআইএস-২) মাধ্যমে রোগীর ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে, যাতে রোগীর পূর্ব ইতিহাস সহজে জানা যাবে এবং নির্ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হাব-স্পোক’ মডেল। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে ‘হাব-স্পোক’ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কেন্দ্রগুলো সংযুক্ত থাকবে। ফলে কোনো রোগীকে যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করতে হয়, তা দ্রুত করা যাবে। এতে যেমন সময় বাঁচবে, রোগীর ভোগান্তিও কমবে। শুধু চিকিৎসা নয়, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে দ্রুতগতির নগরায়ন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নগরবাসীর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় সমস্যা। আমাদের লক্ষ্য সরকারি পর্যায়ে কার্যকর ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নগর স্বাস্থ্য নীড় স্থাপন করা হবে, যেখানে দুই শিফটে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। এতে শহরের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা তাদের নিকটতম কেন্দ্র থেকে সেবা নিতে পারবেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট বিশষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের পথে এই প্রকল্প একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে বর্তমান বস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। বর্তমানে পরিচালিত নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর বেহাল অবস্থা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ল্যাব সুবিধা না থাকায় রোগীরা কার্যত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় নতুন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো যেন আগের নগর স্থাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মতো না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু অবকাঠামো হবে, কিন্তু নগরবাসী সেবা পাবেন না। নগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি সমন্বিত পরিকল্পনা, অনলাইন রেফারেল, বাজেট ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করলেও শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকে। এই দ্বৈত কাঠামোর কারণে সেবা প্রদানে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তাই আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন এবং অনুমোদনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তজুড়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। অনুমোদনের শর্ত হিসেবে স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে বলেছে। এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পটি টেকসইভাবে চালানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছে কমিশন।

তবে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একটি শর্ত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে।

কমিশনের মতামত অনুযায়ী, এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও পিইসি সভার সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশন-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আলোচ্য প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসই ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন। তাই সমঝোতা স্বাক্ষরের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১২:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
৫০৪ বার পড়া হয়েছে

নগরবাসীর জন্য ১৭০ ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ স্থাপন করবে সরকার

আপডেট সময় ১২:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
10

গ্রামাঞ্চলের মতো শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত নয়। ফলে অসুস্থ হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় শহরের মানুষকে এখনও ভরসা করতে হয় বেসরকারি হাসপাতালের ওপর; যা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল। এই বাস্তবতার বদল আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

২০২৮ সালের মাঝামাঝি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শহরের মানুষের জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বড় একটি প্রকল্প। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ঢাকাসহ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে স্থাপন করা হবে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘নগরবাসীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় অনুমোদন পেতে যাচ্ছে আলোচ্য প্রকল্পটি। একনেক সভার কার্যতালিকায় না থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে সরাসরি একনেক সভার টেবিলে উপস্থাপন করা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

নগরবাসীর জন্য সহজপ্রাপ্য ও সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ২০৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর বাকি ৯৪৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক ঋণ হিসেবে, যার বেশির ভাগ দেবে বিশ্বব্যাংক। একনেকে অনুমোদন পেলে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শহরের মানুষকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭০টি ‘নগর স্বাস্থ্য নীড়’ বা সিটি হেলথ সেন্টার স্থাপন করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে হেলথ সেন্টারগুলো স্থাপন করা হবে। হেলথ সেন্টারগুলো হবে শহরের মানুষদের নিকটতম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে সেবার সময়সূচিতে। আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় স্থাপনা করা প্রতিটি কেন্দ্র দুই শিফটে চালু থাকবে। অর্থাৎ সকাল ও বিকেল মানুষ চিকিৎসা নিতে পারবেন। দুই শিফটে চালু থাকায় যারা দিনভর কাজ করেন, তারা সন্ধ্যার দিকে এসেও চিকিৎসা নিতে পারবেন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি নগর স্বাস্থ্য নীড়ে দুই শিফটে সেবা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মানবসম্পদ নিয়োগ করা হবে, যা নগর স্বাস্থ্যসেবায় বড় স্বস্তি এনে দিতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত হলেও শহরাঞ্চলে তেমন কোনো সমমানের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অসুস্থ হলে শহরের মানুষকে এখনো ভরসা করতে হয় সীমিত সরকারি সেবা কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের ওপর। এ ছাড়া সরকারি আউটডোর ও টারশিয়ারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা সাধারণত শুধু সকালে পাওয়া যায়। ফলে কর্মজীবী মানুষ, গৃহিণী বা দিনমজুরদের জন্য চিকিৎসা নেওয়া অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা বদলাতেই নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে কমপক্ষে ৮০ শতাংশ প্রয়োজনীয় ওষুধ সব সময় পাওয়া যায়। পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাও যুক্ত করা হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের (ডিএইচআইএস-২) মাধ্যমে রোগীর ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে, যাতে রোগীর পূর্ব ইতিহাস সহজে জানা যাবে এবং নির্ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘হাব-স্পোক’ মডেল। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শহরাঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে ‘হাব-স্পোক’ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কেন্দ্রগুলো সংযুক্ত থাকবে। ফলে কোনো রোগীকে যদি উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করতে হয়, তা দ্রুত করা যাবে। এতে যেমন সময় বাঁচবে, রোগীর ভোগান্তিও কমবে। শুধু চিকিৎসা নয়, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে দ্রুতগতির নগরায়ন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নগরবাসীর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় সমস্যা। আমাদের লক্ষ্য সরকারি পর্যায়ে কার্যকর ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নগর স্বাস্থ্য নীড় স্থাপন করা হবে, যেখানে দুই শিফটে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যাবে। এতে শহরের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা তাদের নিকটতম কেন্দ্র থেকে সেবা নিতে পারবেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট বিশষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের পথে এই প্রকল্প একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে বর্তমান বস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। বর্তমানে পরিচালিত নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর বেহাল অবস্থা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ল্যাব সুবিধা না থাকায় রোগীরা কার্যত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় নতুন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো যেন আগের নগর স্থাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মতো না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় শুধু অবকাঠামো হবে, কিন্তু নগরবাসী সেবা পাবেন না। নগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি সমন্বিত পরিকল্পনা, অনলাইন রেফারেল, বাজেট ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।

গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা করলেও শহরাঞ্চলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকে। এই দ্বৈত কাঠামোর কারণে সেবা প্রদানে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। তাই আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন এবং অনুমোদনের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তজুড়ে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। অনুমোদনের শর্ত হিসেবে স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে বলেছে। এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পটি টেকসইভাবে চালানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছে কমিশন।

তবে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে একটি শর্ত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে।

কমিশনের মতামত অনুযায়ী, এই সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও পিইসি সভার সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশন-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নগরবাসীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আলোচ্য প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসই ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা প্রয়োজন। তাই সমঝোতা স্বাক্ষরের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।