ঢাকা ১০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শয্যা সংকটে বিপর্যস্ত শিশু ওয়ার্ড

জামালপুরে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর চাপ

জাকিরুল ইসলাম বাবু, জামালপুর::
64

ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জামালপুরে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। এতে করে পুরো জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। শীত থেকে বাঁচতে আগুন পোহাতে গিয়ে সরিষাবাড়ি উপজেলায় শতবর্ষী বৃদ্ধা মরিয়ম বেওয়ার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি। শীতের তীব্রতা আরও বাড়লে রোগীর সংখ্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই নিউমোনিয়া, ঠান্ডা-জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। শয্যা সংকটের কারণে এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে মোট ৬২৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ঠান্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রয়েছে ১২৭ জন। ২৪ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৮৩ জন এবং ৩২ শয্যার শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪৪ জন শিশু। অর্থাৎ শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে।

সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে প্রতি বিছানায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরা অনেকেই মেঝেতে কিংবা বারান্দায় অবস্থান করছেন। মেডিসিন ওয়ার্ডেও জায়গার অভাবে বারান্দায় বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

শিশু রোগীর স্বজন হ্যাপি বেগম বলেন, “ছয় দিন আগে মেয়ের ঠান্ডা-জ্বর শুরু হয়। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ দিয়েও কাজ হয়নি। পরে বমি শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন আল্লাহর রহমতে একটু ভালো আছে।”

ইসলামপুর উপজেলার মুখশিমলা এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “পাঁচ মাস বয়সী নাতনি সর্দি-কাশিতে খুব অসুস্থ। এক বিছানায় দুই-তিনজন বাচ্চা রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। থাকার জায়গা না থাকায় খুব কষ্টে আছি।”

লাঙ্গলজোড়া এলাকার বাসিন্দা রাজিয়া বেগম জানান, “হাসপাতালে এনে কোনো সিট পাইনি। নিচে বিছানা পেতে ছেলের চিকিৎসা নিচ্ছি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাথা ফুলে গিয়েছিল।”

হাসপাতালের নার্স সাদিয়া আক্তার বলেন, “প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শিশু ওয়ার্ডে বেশিরভাগ রোগীই ঠান্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এত রোগী সামলাতে আমাদের খুব চাপ সামলাতে হচ্ছে।”

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, “প্রতিবছর শীতকালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শিশুদের জন্য মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার ও একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট রয়েছেন। আমরা চিকিৎসক ও জায়গা—দুই সংকটেই ভুগছি।”

এদিকে শীতের প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। কুয়াশার কারণে পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় বোরো ধানের বীজতলা ও শীতকালীন সবজি ক্ষেতে রোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

শীত মোকাবিলায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে আরও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, শীত আরও বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে। মঙ্গলবার রাতে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ছিল।

জামালপুর সদর উপজেলার ইউএনও নাজনীন আখতার জানান, ইতোমধ্যে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, “জেলায় সাড়ে সাত হাজার কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।”

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১০:৫৪:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
৫৩৪ বার পড়া হয়েছে

শয্যা সংকটে বিপর্যস্ত শিশু ওয়ার্ড

জামালপুরে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর চাপ

আপডেট সময় ১০:৫৪:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
64

ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জামালপুরে শীতের তীব্রতা দিন দিন বাড়ছে। এতে করে পুরো জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিশু ও বয়স্করা। শীত থেকে বাঁচতে আগুন পোহাতে গিয়ে সরিষাবাড়ি উপজেলায় শতবর্ষী বৃদ্ধা মরিয়ম বেওয়ার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডাজনিত রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি। শীতের তীব্রতা আরও বাড়লে রোগীর সংখ্যাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুই নিউমোনিয়া, ঠান্ডা-জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। শয্যা সংকটের কারণে এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে মোট ৬২৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে ঠান্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু রয়েছে ১২৭ জন। ২৪ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ৮৩ জন এবং ৩২ শয্যার শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪৪ জন শিশু। অর্থাৎ শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি রয়েছে।

সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডে প্রতি বিছানায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অভিভাবকরা অনেকেই মেঝেতে কিংবা বারান্দায় অবস্থান করছেন। মেডিসিন ওয়ার্ডেও জায়গার অভাবে বারান্দায় বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

শিশু রোগীর স্বজন হ্যাপি বেগম বলেন, “ছয় দিন আগে মেয়ের ঠান্ডা-জ্বর শুরু হয়। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ দিয়েও কাজ হয়নি। পরে বমি শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি করাই। এখন আল্লাহর রহমতে একটু ভালো আছে।”

ইসলামপুর উপজেলার মুখশিমলা এলাকার বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “পাঁচ মাস বয়সী নাতনি সর্দি-কাশিতে খুব অসুস্থ। এক বিছানায় দুই-তিনজন বাচ্চা রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। থাকার জায়গা না থাকায় খুব কষ্টে আছি।”

লাঙ্গলজোড়া এলাকার বাসিন্দা রাজিয়া বেগম জানান, “হাসপাতালে এনে কোনো সিট পাইনি। নিচে বিছানা পেতে ছেলের চিকিৎসা নিচ্ছি। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মাথা ফুলে গিয়েছিল।”

হাসপাতালের নার্স সাদিয়া আক্তার বলেন, “প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শিশু ওয়ার্ডে বেশিরভাগ রোগীই ঠান্ডা-জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এত রোগী সামলাতে আমাদের খুব চাপ সামলাতে হচ্ছে।”

জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, “প্রতিবছর শীতকালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শিশুদের জন্য মাত্র দুইজন মেডিকেল অফিসার ও একজন জুনিয়র কনসালটেন্ট রয়েছেন। আমরা চিকিৎসক ও জায়গা—দুই সংকটেই ভুগছি।”

এদিকে শীতের প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। কুয়াশার কারণে পর্যাপ্ত রোদ না পাওয়ায় বোরো ধানের বীজতলা ও শীতকালীন সবজি ক্ষেতে রোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।

শীত মোকাবিলায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝে আরও শীতবস্ত্র বিতরণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, শীত আরও বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং শীতের তীব্রতা অব্যাহত থাকতে পারে। মঙ্গলবার রাতে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে ছিল।

জামালপুর সদর উপজেলার ইউএনও নাজনীন আখতার জানান, ইতোমধ্যে কম্বল বিতরণ শুরু হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, “জেলায় সাড়ে সাত হাজার কম্বল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে শীতার্তদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।”