জামায়াতের সঙ্গে জোটে অনড় এনসিপি নেতৃত্ব, আপত্তি জানিয়ে চিঠি ৩০ কেন্দ্রীয় নেতার
জামায়াত জোটে অনড় এনসিপি, ভেতরে ভেতরে বিভক্তি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে রাজনৈতিক জোট ও আসনভিত্তিক সমীকরণ। বহুল আলোচিত জামায়াত–এনসিপি আসন সমঝোতা ও সম্ভাব্য জোট আজ রোববার আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। নানা আলোচনা–সমালোচনা থাকলেও এই সমঝোতায় অনড় রয়েছে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব। জোটকে কেন্দ্র করেই দুই দলের মধ্যে চূড়ান্ত দরকষাকষি এগোচ্ছে।
এনসিপি সূত্র জানায়, সংস্কার এজেন্ডা, দলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবেই জামায়াতের সঙ্গে এই জোট বা আসন সমঝোতা করা হচ্ছে। এখান থেকে সরে আসার আর সুযোগ নেই—এমন অবস্থানেই রয়েছে নেতৃত্ব। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ২১৬ সদস্যের মধ্যে ১৮৪ জনই এই সমঝোতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এর বিরোধিতা করে ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন।
চিঠিতে তারা এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাসের সাংঘর্ষিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারা এই জোটকে দলীয় আদর্শের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন।
এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)সহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হচ্ছে। এই বৃহত্তর সংস্কার জোটের অংশ হিসেবেই এনসিপি অন্তত ৫০ আসন দাবি করেছিল। শেষ পর্যন্ত ৪০ আসনে এনসিপির প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জোটে জামায়াতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়ার প্রত্যাশা এনসিপির।
দলটি প্রথম ধাপে ১২৫ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও সমঝোতা চূড়ান্ত হলে বাকি আসনগুলোতে তারা প্রার্থী না দিয়ে জোটের পক্ষে কাজ করবে। দলের এক নির্বাহী সদস্য জানান, সম্ভাব্য জোটের সর্বশেষ বৈঠকে এনসিপি অন্তত ৪০ আসন এবং জোটের মুখপাত্র হিসেবে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে আজই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
এদিকে কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জনের আপত্তির মধ্যেও ভাঙন ধরেছে। এরই মধ্যে দুজন তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করেছেন। ১০ জন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে ৯ জনই সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এনসিপির অঙ্গসংগঠন—জাতীয় যুব শক্তি, শ্রমিক শক্তি ও জাতীয় ছাত্র শক্তিও প্রকাশ্যে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়েছে।
তবে এই জোটকে কেন্দ্র করে দল ছাড়ার ঘটনাও ঘটেছে। এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা পদত্যাগ করেছেন। তিনি ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির প্রার্থী ছিলেন। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন। এর আগে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থী মীর আরশাদুল হক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। দলীয় সূত্র বলছে, আপত্তি জানানো নেতাদের মধ্য থেকে আরও কয়েকজন পদত্যাগ করতে পারেন।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে কিছু বিভেদ তৈরি হয়েছে। তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য ও সংস্কারের প্রশ্নে অধিকাংশ নেতা একমত হয়েছেন। কে পদত্যাগ করবেন, সেটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’
এদিকে সমঝোতার পক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির আরেকটি অংশ পাল্টা চিঠি দিয়ে দলীয় প্রধানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলেছেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জনমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সময়োপযোগী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় যেকোনো জোট বা আসন সমঝোতায় আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের সিদ্ধান্তের প্রতি তারা আস্থা রাখেন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদিন শিশির বলেন, ‘আসন সমঝোতা চূড়ান্ত। আজ–কালকের মধ্যেই ঘোষণা আসবে। বিএনপি বাদে জুলাইয়ের শক্তিগুলো যদি এক হয়, বিশেষ করে এনসিপি ও জামায়াতসহ ৮ দলীয় জোট—তাহলে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে।’
অন্যদিকে, জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, দলটি দেড়শ থেকে দুই শতাধিক আসনে প্রার্থী দেবে। জোট চূড়ান্ত হলে এনসিপি, এবি পার্টিসহ মিত্রদের জন্য বাকি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান বলেন, ‘এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যেই সব চূড়ান্ত হবে।’
সব মিলিয়ে, জামায়াত–এনসিপি জোট এখন সময়ের অপেক্ষা। তবে এই জোট এনসিপির ভেতরে আদর্শিক বিতর্ক, পদত্যাগ ও বিভক্তির রেখাও স্পষ্ট করে তুলেছে।


























