কাবার কিসওয়া: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নির্মাণের অজানা গল্প
গিলাফ ছাড়া কাবা শরিফ দেখতে কেমন

মক্কার পবিত্র কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে পবিত্র ইবাদতকেন্দ্র। সাধারণত কালো রঙের মনোমুগ্ধকর আচ্ছাদনে আবৃত এই কাবা ঘরের গিলাফ বা মুখোশকে কিসওয়া বলা হয়। অনেকের কৌতূহল—গিলাফ ছাড়া কাবা শরিফ দেখতে কেমন? প্রতি বছর কিসওয়া পরিবর্তনের সময় অল্প সময়ের জন্য সেই দৃশ্য দেখা যায়, যখন কাবা শরিফের প্রকৃত পাথুরে অবয়ব প্রকাশ পায়।
প্রতি বছর হিজরি ক্যালেন্ডারের জিলহজ মাসের ৯ তারিখে কাবা শরিফের কিসওয়া পরিবর্তন করা হয়। আছরের নামাজের আগেই পুরোনো কিসওয়া খুলে নতুন কিসওয়া পরানো হয়। পুরোনো কিসওয়া পরে নিরাপদে কিসওয়া কারখানায় সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। এই সময় গিলাফ ছাড়া কাবা শরিফের ঐতিহাসিক কাঠামো ও প্রাচীন পাথরের গাঁথুনি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
সৌদি আরবে অবস্থিত কিং আব্দুল আজিজ কিসওয়া কমপ্লেক্সে কিসওয়া প্রস্তুত করা হয়। এখানে ২৪০ জনেরও বেশি দক্ষ কর্মী কাজ করেন। বিশ্বের বৃহত্তম ১৬ মিটার উচ্চতার সেলাই মেশিন, উন্নত জ্যাকার্ড মেশিন, পরীক্ষাগার ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কিসওয়া তৈরির প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়।
একটি কিসওয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয় প্রায় ৬৭০ কেজি খাঁটি রেশম, যার মধ্যে ১০ কেজি সোনা ও রুপা মিশ্রিত সুতা থাকে। মোট ৪৭টি রোল কাপড় দিয়ে কিসওয়া তৈরি হয়। কাবার বেল্ট অংশে কুরআনের আয়াত সোনা ও রুপার সূক্ষ্ম সূচিকর্মে খোদাই করা থাকে। প্রতিটি কিসওয়া তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় ১০ মাস, আর ব্যয় হয় আনুমানিক ২২ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল।
ইতিহাস অনুযায়ী, নবি মুহাম্মদ (সা.) প্রথম ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা শরিফ ঢেকে দেন। এরপর খলিফা আবু বকর, উমর ও উসমান (রা.) বিভিন্ন রঙের কাপড় ব্যবহার করেন। আব্বাসীয় যুগে কালো রঙের কিসওয়া প্রচলিত হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ও স্পর্শ সহনশীল হওয়ায় আজ পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
এমনকি প্রাক-ইসলামিক যুগেও কাবা শরিফ ঢাকার প্রথা ছিল। ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আল-হুমাইরির আমলে মোটা কাপড় দিয়ে কাবা আচ্ছাদিত করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচ্ছাদন আরও নান্দনিক ও টেকসই রূপ লাভ করে।
গিলাফ ছাড়া কাবা শরিফ শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি ইসলামের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। আর কিসওয়া হলো সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক, যা যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।


























