বিরোধ ভুলে ঐক্যের পথে রাজনৈতিক দলগুলো
খালেদা জিয়ার মৃত্যু পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শোকাবহ অধ্যায়ের সূচনা করলেও, এর পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্যপট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলমত নির্বিশেষে প্রায় সব রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। শোক প্রকাশের পাশাপাশি তারা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা—বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ এই ঘটনাপ্রবাহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতার কারণে দলগুলোর মধ্যে প্রতিহিংসা, মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকা এমনকি সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার মতো চরম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণ নিঃসন্দেহে রাজনীতিতে স্বস্তির বার্তা বহন করছে।
বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তারেক রহমান ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সাক্ষাতে জামায়াত আমির বলেন, দেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে—একটি সরকার গঠনের জন্য, অন্যটি সংস্কারের জন্য। এই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ হয়—এটাই সবার প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে সব দল মিলেমিশে ভাবতে পারে। তারেক রহমানসহ উপস্থিত বিএনপি নেতারাও একই আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। যদিও বিএনপি ও জামায়াত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, তবু দীর্ঘদিনের সমমনা আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাসের কারণে এখনো তাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রয়েছে।
একই দিনে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ছাত্রসমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। সাদিক কায়েম জানান, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মতপার্থক্য গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলেও বাংলাদেশ ও জুলাই বিপ্লবের প্রশ্নে সবাইকে এক থাকতে হবে। বিএনপি, জামায়াতসহ সব ফ্যাসিবাদবিরোধী দল এবং ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ সব ছাত্রসংগঠনকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু জামায়াত বা ছাত্রনেতৃত্ব নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই তারেক রহমানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি আত্মনির্ভরশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে, যা রাজনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগমনে দেশের রাজনীতিতে সুবাতাস বইছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।”
তবে ভিন্নমতও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, শোক প্রকাশ ও সমবেদনা জানানো ভদ্রতা ও শালীনতার অংশ, এ নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা টানার প্রয়োজন নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিদেশে অবস্থান করেও একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার অপসারণে নেতৃত্ব দেওয়া তারেক রহমানের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তাঁর দেশে ফেরার ফলে রাজনৈতিক আচরণ ও জনমনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে এটি দেশের অস্থিরতা কমিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, শোকের আবহ থেকে জন্ম নেওয়া এই রাজনৈতিক সৌহার্দ্য যদি টেকসই হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই এক স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিতে পারে।

























