ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শোক, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের বছর পেরিয়ে নতুন আশার আলোয় বাংলাদেশ ২০২৬-এ পদার্পণ

অশ্রুসিক্ত ২০২৫ শেষে আশার পথে বাংলাদেশ ২০২৬

চেকপোস্ট ডেস্ক::
202

পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে ২০২৫ সালের শেষ সূর্য। পেছনে পড়ে রইল ভাঙা-গড়ার সাক্ষী হয়ে থাকা এক উত্তাল অধ্যায়। জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের মানুষ আজ আরেকটি নতুন বছরে পা রাখছে—তবে এই যাত্রা নিছক সময়ের আবর্তন নয়; এটি দু’চোখ ভরা, এক বুক স্বপ্নের পথচলা। প্রতিরোধ, শোক আর মাথা নত না করা এক অদম্য জাতির অমর উপাখ্যানে লেখা ছিল ২০২৫ সালের প্রতিটি দিন।

বছরের বিদায়বেলায় শোকের ছায়া গ্রাস করেছে পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি হৃদয়। বিদায়ের সেই অশ্রুসিক্ত মুহূর্তে প্রমাণিত হয়েছে—এই দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি যে গভীর শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তা কোনো রাজনৈতিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। ভালোবাসা আর পরম শ্রদ্ধায় মানুষ বিদায় জানিয়েছে তাদের প্রিয় নেত্রীকে।

এই শোকের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে সমাজের বিবেককে। যেন আরেকবার ঘোষণা দিয়েছে—মানুষ আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর অন্যায়ের ছায়ায় মাথানত করতে রাজি নয়।

তবুও শোকের এই দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে জাতি আজ বুক বাঁধছে এক অমোঘ গর্বে। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; শহীদদের রক্ত আজ এক নতুন যুগের শিকড়ে প্রাণ সঞ্চার করেছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক মহাবিপ্লবের দোরগোড়ায়। এই দেশের মাটি আজ উর্বর হয়েছে নতুন এক পুনর্জাগরণের অঙ্গীকারে।

সব ভাঙন আর দুর্বলতার মাঝেও ২০২৫ কোনো আত্মসমর্পণের বছর ছিল না; এটি ছিল জাগরণের বছর। তবে রূপান্তরের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। এই পরিবর্তনও তার চরম মূল্য নিয়েছে। শূন্য হয়েছে বহু মায়ের কোল, প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে হাহাকার করছে অসংখ্য ঘর। জীবনের গতি থমকে গিয়েছিল, স্থবির হয়েছিল জীবিকার চাকা। শরীরের দৃশ্যমান ক্ষত আর মনের গভীরে জমে থাকা অদৃশ্য দাগগুলো আজ জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০২৫-এর ক্ষত হয়তো মুছে যাবে না, তবে সেগুলো বহন করবে এক অপরাজেয় সাহসিকতার পদক। পুরোনো, ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতিটি ফাটল আজ হয়ে উঠছে নতুন সৃষ্টির উর্বর ভূমি। যেখানে একসময় দুর্নীতির রাজত্ব ছিল, সেখানে আজ ন্যায়বিচারের চারা রোপিত হচ্ছে। হতাশার জায়গায় ডানা মেলছে সম্ভাবনা, বিভেদের বিষবাষ্প সরিয়ে জেগে উঠছে এক অভূতপূর্ব ঐক্য।

দেশ গড়ার এই মহাযজ্ঞ কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এ দেশের মানুষ আজ নিজের ভাগ্যের চাবিকাঠি নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ, এই গণজাগরণের হৃৎস্পন্দন, আজ আগামীর আধুনিক বাংলাদেশের প্রধান কারিগর হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশৃঙ্খল ও কণ্টকাকীর্ণ হলেও ২০২৫ ছিল এই মহাকাব্যের এক অপরিহার্য অধ্যায়।

২০২৬ সালের ভোরের প্রথম আলো যখন দিগন্তে উঁকি দেবে, তখন তা মনে হবে দীর্ঘ বিরহের পর এক মমতাময়ী সন্ধি। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিলের গর্জনে প্রকম্পিত ছিল, সেখানে এবার পড়বে স্বপ্নদ্রষ্টা ও নির্মাতাদের শান্ত কিন্তু দৃঢ় পদচারণা।

২০২৬ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্ম। উত্তাল সময়ের শিক্ষাই হবে আগামীর পথপ্রদর্শক—এই অঙ্গীকার নিয়েই নতুন বছরে পদার্পণ। বাংলাদেশ এখন আর শুধু টিকে থাকায় সন্তুষ্ট নয়; অদম্য সাহসে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর।

এই নতুন বাংলাদেশের কিছু অপূর্ণতা থাকতেই পারে, কারণ কোনো রাষ্ট্রই নিখুঁত নয়। কিন্তু এই বাংলাদেশ এখন অকুতোভয় হয়ে স্বপ্ন দেখতে জানে, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে জানে এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে নতুন কিছু গড়তে জানে। ২০২৫ সালের প্রতিটি বিসর্জন আজ রূপ নিচ্ছে ন্যায়বিচার, সাম্য ও সমৃদ্ধির ভিত্তিপ্রস্তরে।

২০২৬ সালের ভোর কেবল সূচনা নয়; এটি এক পুনর্জন্মের ঘোষণা। অশান্ত সময়ের শিক্ষা ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের পথ দেখাবে—এই প্রতিশ্রুতিই এর মর্মকথা। এই জাতি আর কেবল টিকে থাকার কথা ভাববে না; দৃঢ়ভাবে, নির্ভীকভাবে এগিয়ে যাবে শ্রেষ্ঠত্বের পথে।

একই সঙ্গে ২০২৬ আমাদের সামনে রেখে দিয়েছে এক বিশাল প্রশ্ন এই যে সুযোগ, তা দিয়ে আমরা কী গড়বো? আজ বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠে এক সুর, সবার হাতে নতুন ইতিহাস লেখার কলম।

নদী বয়ে চলে অবিরাম, বাতাসের কানে কানে ভেসে আসে আশার গুঞ্জন। শোকের ভারে নুয়ে নয়, অর্জনের শক্তিতে ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে এই দেশ।

২০২৬ কেবল একটি নতুন বছর নয়। আসছে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—ইতিহাসের অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচন, যার মধ্য দিয়ে সূচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন প্রারম্ভ।

বাংলাদেশ আজ তার সোনালি ভবিষ্যতের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে যা এ দেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি ও আশার অবিনাশী শক্তির এক জীবন্ত দলিল।

সূত্র: বাসস

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১২:৩৯:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
৬০২ বার পড়া হয়েছে

শোক, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের বছর পেরিয়ে নতুন আশার আলোয় বাংলাদেশ ২০২৬-এ পদার্পণ

অশ্রুসিক্ত ২০২৫ শেষে আশার পথে বাংলাদেশ ২০২৬

আপডেট সময় ১২:৩৯:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
202

পশ্চিম আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে ২০২৫ সালের শেষ সূর্য। পেছনে পড়ে রইল ভাঙা-গড়ার সাক্ষী হয়ে থাকা এক উত্তাল অধ্যায়। জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের মানুষ আজ আরেকটি নতুন বছরে পা রাখছে—তবে এই যাত্রা নিছক সময়ের আবর্তন নয়; এটি দু’চোখ ভরা, এক বুক স্বপ্নের পথচলা। প্রতিরোধ, শোক আর মাথা নত না করা এক অদম্য জাতির অমর উপাখ্যানে লেখা ছিল ২০২৫ সালের প্রতিটি দিন।

বছরের বিদায়বেলায় শোকের ছায়া গ্রাস করেছে পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি হৃদয়। বিদায়ের সেই অশ্রুসিক্ত মুহূর্তে প্রমাণিত হয়েছে—এই দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি যে গভীর শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তা কোনো রাজনৈতিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। ভালোবাসা আর পরম শ্রদ্ধায় মানুষ বিদায় জানিয়েছে তাদের প্রিয় নেত্রীকে।

এই শোকের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে সমাজের বিবেককে। যেন আরেকবার ঘোষণা দিয়েছে—মানুষ আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর অন্যায়ের ছায়ায় মাথানত করতে রাজি নয়।

তবুও শোকের এই দরিয়ায় ভাসতে ভাসতে জাতি আজ বুক বাঁধছে এক অমোঘ গর্বে। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি; শহীদদের রক্ত আজ এক নতুন যুগের শিকড়ে প্রাণ সঞ্চার করেছে। ক্ষতবিক্ষত হয়েও বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক মহাবিপ্লবের দোরগোড়ায়। এই দেশের মাটি আজ উর্বর হয়েছে নতুন এক পুনর্জাগরণের অঙ্গীকারে।

সব ভাঙন আর দুর্বলতার মাঝেও ২০২৫ কোনো আত্মসমর্পণের বছর ছিল না; এটি ছিল জাগরণের বছর। তবে রূপান্তরের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। এই পরিবর্তনও তার চরম মূল্য নিয়েছে। শূন্য হয়েছে বহু মায়ের কোল, প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে হাহাকার করছে অসংখ্য ঘর। জীবনের গতি থমকে গিয়েছিল, স্থবির হয়েছিল জীবিকার চাকা। শরীরের দৃশ্যমান ক্ষত আর মনের গভীরে জমে থাকা অদৃশ্য দাগগুলো আজ জাতীয় সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০২৫-এর ক্ষত হয়তো মুছে যাবে না, তবে সেগুলো বহন করবে এক অপরাজেয় সাহসিকতার পদক। পুরোনো, ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতিটি ফাটল আজ হয়ে উঠছে নতুন সৃষ্টির উর্বর ভূমি। যেখানে একসময় দুর্নীতির রাজত্ব ছিল, সেখানে আজ ন্যায়বিচারের চারা রোপিত হচ্ছে। হতাশার জায়গায় ডানা মেলছে সম্ভাবনা, বিভেদের বিষবাষ্প সরিয়ে জেগে উঠছে এক অভূতপূর্ব ঐক্য।

দেশ গড়ার এই মহাযজ্ঞ কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এ দেশের মানুষ আজ নিজের ভাগ্যের চাবিকাঠি নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ, এই গণজাগরণের হৃৎস্পন্দন, আজ আগামীর আধুনিক বাংলাদেশের প্রধান কারিগর হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশৃঙ্খল ও কণ্টকাকীর্ণ হলেও ২০২৫ ছিল এই মহাকাব্যের এক অপরিহার্য অধ্যায়।

২০২৬ সালের ভোরের প্রথম আলো যখন দিগন্তে উঁকি দেবে, তখন তা মনে হবে দীর্ঘ বিরহের পর এক মমতাময়ী সন্ধি। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিলের গর্জনে প্রকম্পিত ছিল, সেখানে এবার পড়বে স্বপ্নদ্রষ্টা ও নির্মাতাদের শান্ত কিন্তু দৃঢ় পদচারণা।

২০২৬ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্ম। উত্তাল সময়ের শিক্ষাই হবে আগামীর পথপ্রদর্শক—এই অঙ্গীকার নিয়েই নতুন বছরে পদার্পণ। বাংলাদেশ এখন আর শুধু টিকে থাকায় সন্তুষ্ট নয়; অদম্য সাহসে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর।

এই নতুন বাংলাদেশের কিছু অপূর্ণতা থাকতেই পারে, কারণ কোনো রাষ্ট্রই নিখুঁত নয়। কিন্তু এই বাংলাদেশ এখন অকুতোভয় হয়ে স্বপ্ন দেখতে জানে, অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে জানে এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে নতুন কিছু গড়তে জানে। ২০২৫ সালের প্রতিটি বিসর্জন আজ রূপ নিচ্ছে ন্যায়বিচার, সাম্য ও সমৃদ্ধির ভিত্তিপ্রস্তরে।

২০২৬ সালের ভোর কেবল সূচনা নয়; এটি এক পুনর্জন্মের ঘোষণা। অশান্ত সময়ের শিক্ষা ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের পথ দেখাবে—এই প্রতিশ্রুতিই এর মর্মকথা। এই জাতি আর কেবল টিকে থাকার কথা ভাববে না; দৃঢ়ভাবে, নির্ভীকভাবে এগিয়ে যাবে শ্রেষ্ঠত্বের পথে।

একই সঙ্গে ২০২৬ আমাদের সামনে রেখে দিয়েছে এক বিশাল প্রশ্ন এই যে সুযোগ, তা দিয়ে আমরা কী গড়বো? আজ বাংলাদেশের মানুষের কণ্ঠে এক সুর, সবার হাতে নতুন ইতিহাস লেখার কলম।

নদী বয়ে চলে অবিরাম, বাতাসের কানে কানে ভেসে আসে আশার গুঞ্জন। শোকের ভারে নুয়ে নয়, অর্জনের শক্তিতে ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে এই দেশ।

২০২৬ কেবল একটি নতুন বছর নয়। আসছে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—ইতিহাসের অন্যতম অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচন, যার মধ্য দিয়ে সূচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন প্রারম্ভ।

বাংলাদেশ আজ তার সোনালি ভবিষ্যতের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে যা এ দেশের মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি ও আশার অবিনাশী শক্তির এক জীবন্ত দলিল।

সূত্র: বাসস