বেগুনি ও কমলা ফুলকপিতে সফলতা, নতুন সম্ভাবনার দেখছে কৃষকরা
রঙিন ফুলকপি চাষে বদলাচ্ছে দিনাজপুরের কৃষিচিত্র

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় নীরবে শুরু হয়েছে কৃষিতে এক নতুন পরিবর্তন। প্রচলিত সাদা ফুলকপির পাশাপাশি এখন কৃষকরা চাষ করছেন বেগুনি, কমলা ও খয়েরি রঙের ফুলকপি। এই পরিবর্তনের অগ্রদূত নশরতপুর ইউনিয়নের কৃষক মতিয়ার রহমান। তার সাফল্য ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন, নাকি দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সূচনা?
চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর গ্রামের কাজিপাড়ার কৃষক মতিয়ার রহমান দীর্ঘদিন ধরে সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত। চলতি মৌসুমে ঝুঁকি নিয়ে তিনি শুরু করেন রঙিন ফুলকপি চাষ। সহজলভ্য বীজের অভাব ও অনিশ্চিত বাজার সত্ত্বেও নতুন এই জাতের চাষে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
মতিয়ার রহমান জানান, টেলিভিশনে রঙিন ফুলকপির ছবি দেখে আগ্রহ জন্মালেও শুরুতে বীজ সংগ্রহ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দিনাজপুর, বীরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও রংপুর ঘুরেও বীজ না পেয়ে পরে সিনজেন্টা কোম্পানির এক প্রতিনিধির মাধ্যমে প্যাকেটবিহীন বেগুনি ‘ভেলেনটিনা’ ও কমলা ‘কেরটিনা’ জাতের বীজ সংগ্রহ করেন। নিজ হাতে চারা উৎপাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চাষ কার্যক্রম।
এই চাষের অন্যতম দিক হলো, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতি। কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করেই তিনি আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন। চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় তিনি ৪০ শতক জমিতে রঙিন ফুলকপি ও ব্রুকলি এবং ১৫ শতক জমিতে স্কোয়াশ চাষ করেন। এতে মোট খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকা।
চারা রোপণের ৭০ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যেই ফুলকপি সংগ্রহ শুরু হয়। স্থানীয় বাজারে সাধারণ ফুলকপি যেখানে কেজিপ্রতি ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে রঙিন ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা দরে। বাজারে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এসব ফুলকপি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, যা ভোক্তাদের আগ্রহ ও চাহিদার প্রমাণ দিচ্ছে।
মতিয়ার রহমান বলেন, তার চাষের খরচ ইতোমধ্যে উঠে এসেছে এবং চলতি মৌসুমে আরও অন্তত ৩০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রির আশা করছেন। কম খরচে বেশি লাভ পাওয়ায় রঙিন ফুলকপি চাষ কৃষকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চিরিরবন্দর উপজেলায় ১৮০ শতক জমিতে ছয়টি রঙিন ফুলকপির প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। অমরপুর ইউনিয়নের পুলক রায়, আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের ভবতোষ রায়, ভিয়াইল ইউনিয়নের জুলেখা খাতুন এবং তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের চিত্ররঞ্জনসহ আরও অনেকে এই চাষে যুক্ত হয়েছেন।
নশরতপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. খাদেমুল ইসলাম জানান, রঙিন ফুলকপিতে সাধারণ ফুলকপির তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি ক্যারোটিন রয়েছে, যা চোখ ও ত্বকের জন্য উপকারী।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বলেন, রঙিন ফুলকপির পুষ্টিগুণ ও বাজারমূল্য দুটোই বেশি। টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এই চাষ সম্প্রসারণে কাজ করা হচ্ছে।
সঠিক পরামর্শ, মানসম্মত বীজ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে রঙিন ফুলকপি দিনাজপুর অঞ্চলের একটি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসলে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন কৃষকের সাহসী উদ্যোগ কীভাবে একটি অঞ্চলের কৃষিচিন্তাকে বদলে দিতে পারে রঙিন ফুলকপি চাষে মতিয়ার রহমানের সাফল্য তারই বাস্তব উদাহরণ।




















