কুয়েটে আন্তর্জাতিক মানের এমইআরসি ল্যাবের যাত্রা শুরু

দেশের অন্যতম প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)-এ আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মেটেরিয়ালস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (এমইআরসি) ল্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এক ছাদের নিচে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত এই ল্যাবকে গবেষকদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ “ওয়ান স্টপ সলিউশন” হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, কুয়েটে এমইআরসি ল্যাব চালু হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশের গবেষণা ও শিল্প খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হবে। বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের গুণগত মান যাচাই এবং চূড়ান্ত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ল্যাবটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হলো।
এমইআরসি ল্যাবে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ ইকুইপমেন্ট খুব দ্রুত যুক্ত করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের “Expansion of Infrastructure and Academic Activities of Khulna University of Engineering & Technology” প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ল্যাবটি স্থাপন করা হয়েছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৪ সালে এই ল্যাবটি ইউজিসি কর্তৃক কুয়েট ল্যাব সেন্টার হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। এখানে স্থাপিত কিছু যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে এই প্রথম আমদানি করা হয়েছে। পূর্বে এ ধরনের সংবেদনশীল গবেষণার জন্য নমুনা বিদেশে পাঠাতে হতো, যা ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এমইআরসি ল্যাব পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে দেশীয় গবেষকদের আর বিদেশমুখী হতে হবে না, ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
ল্যাবটিতে রয়েছে ন্যানো টেকনোলজি, যা ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার স্কেলে পদার্থ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে নতুন উপাদান এবং উচ্চ কার্যকারিতা সম্পন্ন পণ্য তৈরি করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তি ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা, শক্তি উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
এছাড়া প্রায় ৩০০ টন বল প্রয়োগে সক্ষম ইউনিভার্সেল টেস্টিং মেশিন (UTM) স্থাপন করা হয়েছে, যা উচ্চ শক্তি সম্পন্ন কংক্রিট ও স্টিলের চাপ ও টান সহনশীলতা পরীক্ষা করতে পারবে—যা দেশের অবকাঠামোগত গবেষণায় একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
ল্যাবে আরও রয়েছে X-ray Photoelectron Spectroscopy (XPS), ICP-MS, GC-MS, যা পরিবেশগত নমুনা, সেমিকন্ডাক্টর, খাদ্য ও রাসায়নিক গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও এমইআরসি পরিচালক ড. মো. আসরাফুল ইসলাম বলেন,
“এই সেন্টারে অ্যাডভান্স ম্যাটেরিয়ালস, কম্পোজিট, পরিবেশ দূষণ, সেমিকন্ডাক্টর, পলিমারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্লেষণ সম্ভব। এখানে এমন কিছু ইকুইপমেন্ট রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে DSC, TGA, BET, Raman Spectrometer, AFM, CHNS Analyzer, X-ray CTসহ আরও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হবে, যা গবেষণা ও শিল্প উভয় খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে কেবল কুয়েট নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা এই ল্যাবের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করছেন। নীরবে দেশের উচ্চ শিক্ষা ও শিল্প গবেষণায় বিপ্লব ঘটাতে প্রস্তুত কুয়েটের এই এমইআরসি ল্যাব সেন্টার।


























