প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
সৈয়দপুরে আহমেদ প্লাইউডের বিরুদ্ধে তদন্ত, শ্রমিকদের দিয়ে মহাসড়ক অবরোধের অভিযোগ
শাহজাহান আলী মনন,, সৈয়দপুর প্রতিনিধি:: ||
নীলফামারীর সৈয়দপুরে আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার পর শ্রমিকদের দিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করানোর অভিযোগ উঠেছে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধের কারণে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোগান্তিতে পড়া চালকদের প্রতিবাদের মুখে সড়ক থেকে সরে যান শ্রমিকরা।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে সৈয়দপুরের কামারপুকুর ধলাগাছ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ কাস্টমসের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেন। এ সময় কাস্টমস কর্মকর্তাদের হেনস্তা ও অপদস্ত করার অভিযোগও উঠেছে।অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বৃহস্পতিবার দুপুরে কারখানার ভেতরে কয়েকজন সংবাদকর্মীকে ডেকে কাস্টমসের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে কর্তৃপক্ষ। পরে শ্রমিকদের জানানো হয়, কাস্টমস সব কাগজপত্র ও ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ায় চলতি মাসে তাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। বেতন পেতে হলে আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনকে জব্দ করা নথিপত্র ও ল্যাপটপ ফেরত দিতে বাধ্য করতে হবে।এরপর শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে গেটের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে বসে পড়েন। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে অবরোধ। এ সময় শ্রমিকরা বেতন পাওয়ার জন্য জব্দ করা নথিপত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।তবে বেতনের দাবিতে মালিকপক্ষের কাছে না গিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করার কারণ জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, কাগজপত্র না থাকায় কর্তৃপক্ষ বেতন দিতে পারছে না বলে জানিয়েছে। সে কারণেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।এদিকে অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়েন শত শত গাড়ির চালক ও হেলপার। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী চালকরা একজোট হয়ে সড়কে নেমে প্রতিবাদ জানান। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।প্রতিবাদকারীরা শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, বেতন দেওয়ার দায়িত্ব মালিকপক্ষের। তাই বেতনের দাবিতে মালিকের কাছে না গিয়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা কেন? কাস্টমস নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করলেও তাতে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার বিষয়টি আটকে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলেও তারা মন্তব্য করেন।তাদের দাবি, কোম্পানির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবেই কাস্টমস নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে। এতে আপত্তি থাকলে মালিকপক্ষ আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের ব্যবহার করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা উচিত নয়।এ সময় স্থানীয়রা কারখানায় শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও মজুরি বৈষম্যের অভিযোগও তুলে ধরেন। এসব বিষয় জানার পর শ্রমিকদের অনেকেই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে কর্মসূচি শেষ করার উদ্যোগ নেন। তবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন এতে আপত্তি জানান। এতে অবরোধে আটকে থাকা চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। একপর্যায়ে চালকরা একযোগে গাড়ি চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সড়ক ছেড়ে চলে যান।স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, কারখানাটি তাদের জমির ওপর গড়ে উঠলেও স্থানীয়দের সেখানে কাজের সুযোগ দেওয়া হয় না। শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও দাবি করেন তারা। এ ছাড়া ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিতে রাতের আঁধারে শত শত ট্রাকভর্তি মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, এসব অনিয়মের অভিযোগের কারণেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে। জমি কেনার ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের বাধ্য করার অভিযোগ তুলে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।নীলফামারী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কারখানার মালিক আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার অভিযোগ, অতীতে প্রতিষ্ঠানটি শত শত কোটি টাকার ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে। এসব অনিয়ম তদন্ত করতেই কাস্টমস নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে। এর সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। নিজেদের স্বার্থে শ্রমিকদের উসকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, মিথ্যা অভিযোগ তুলে অপরাধ আড়াল এবং সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ ঘটনায় কারখানার মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।তবে শ্রমিকদের দিয়ে সড়ক অবরোধ করানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, তারা শ্রমিকদের সড়কে নামাননি; বরং কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি অন্যায় করেছে। তার দাবি, সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে কাস্টমসের ভেতরে থাকা সরকারবিরোধীরা এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করায় তারা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছেন না, তাই শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন।কাস্টমসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামতে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনগত ব্যবস্থা নিতে সময়ের প্রয়োজন।অন্যদিকে শ্রমিকদের সড়কে নামার পেছনে কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় ও উসকানি রয়েছে—স্থানীয়দের এমন অভিযোগের জবাবে জিএম বলেন, শ্রমিকরা শুধু বেতনের জন্য কাজ করেন, তারা কর্তৃপক্ষের হুকুমে চলেন না। তবে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ জনদুর্ভোগের জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেন জিএম।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত