প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
স্থানীয় নির্বাচনে মাঠে নামছে ইসলামি দলগুলো, কার কত প্রস্তুতি?
চেকপোস্ট নিউজ, ||
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে কয়েকটি ইসলামি রাজনৈতিক দল। সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে দলগুলো। এরই মধ্যে কিছু দল সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে, কোথাও চলছে প্রচার-প্রচারণা ও উঠান বৈঠক। তবে কোনো কোনো দল এখনো প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, আবার কিছু দলের স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা নেই।স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সবচেয়ে সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটি সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলও প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। তবে দলগুলোর প্রস্তুতি, নির্বাচনি কৌশল ও প্রার্থী দেওয়ার পরিধিতে রয়েছে ভিন্নতা।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: সব নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনাস্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। কেন্দ্রে জমা পড়া আগ্রহী প্রার্থীদের তালিকা ধরে সাক্ষাৎকারও শুরু হয়েছে।যাচাই-বাছাই শেষে আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে বা ডিসেম্বরের শুরুতে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। দলের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।ঢাকার দুই সিটিতে ইতোমধ্যে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। ঢাকা দক্ষিণে দলের সহকারী মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি শেখ ফজলুল করীম মারুফ এবং উত্তরে ইসলামী যুব আন্দোলনের সভাপতি আতিকুর রহমান মুজাহিদকে প্রার্থী করা হয়েছে। তাঁরা ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালাচ্ছেন।সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিতে চায় দলটি। তবে ইউপি সদস্য পদে সব জায়গায় প্রার্থী দেওয়া হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ২৬৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছিল ইসলামী আন্দোলন। দলটির নেতারা মনে করছেন, ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন তাঁরা।তবে দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন করাকে একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে দলটি। ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচন করা কঠিন। সরকারদলীয় প্রতীক ধানের শীষ না থাকায় আমরা বেশ আশাবাদী।তিনি আরও বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দলটির নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের সংখ্যা বাড়বে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ৩০ জেলা ‘এ গ্রেড’ তালিকায়স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া ২৫টি আসনসহ ৩০টি জেলাকে ‘এ গ্রেড’ তালিকায় রেখেছে দলটি। এর বাইরে আরও কিছু জেলা ও উপজেলাও রয়েছে তাদের বিবেচনায়।দলটি ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনি প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য গঠন করা হয়েছে নির্বাচন পরিচালনা ও প্রস্তুতি কমিটি। এ কমিটি প্রার্থী বাছাই এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে।দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকা তাঁদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তাঁদের মতে, দলীয় প্রতীক থাকলে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব নির্বাচনে বাধা তৈরি করতে পারে।দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, তাঁরা ভালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামছেন। জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া আসনসহ আরও কিছু জেলা-উপজেলায় প্রার্থীদের বিজয়ের আশা করছেন তাঁরা। নির্বাচনের আগে কোনো সমঝোতা হলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম: চলছে প্রার্থী চূড়ান্তের কাজজেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে কাজ করছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের নেতাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের পাঠানো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।পটুয়াখালীর একাধিক উপজেলা ও কিশোরগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রাথমিক সবুজ সংকেত দিয়েছে দলটি। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করতে আরও কিছুটা সময় নিতে চায় জমিয়ত।বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটে থাকা দলটি স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক না থাকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। দলটির নেতাদের মতে, প্রতীক না থাকলে সরকারি দলের প্রতীকের প্রভাব এড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।যেসব এলাকায় জমিয়তের নিজস্ব প্রার্থী থাকবে না, সেখানে বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে তাদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে দলটি। সমঝোতা না হলে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।জমিয়তের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছে দলটি। ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকলে নির্বাচনে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার আশা করেন তিনি।খেলাফত মজলিস: তফসিলের অপেক্ষায়স্থানীয় নির্বাচনে সাংগঠনিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে খেলাফত মজলিস। তবে এখনো দলটির পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি এবং কোনো প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হয়নি।আগামী নভেম্বরে নির্বাহী কমিটির ত্রৈমাসিক বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরিচিত মুখকে গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারে দলটি।দলটির নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দলের প্রভাব বেশি থাকে। সিটি করপোরেশনগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষমতাসীন দল চেষ্টা করে বলে তাঁদের ধারণা। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।নিজেদের প্রার্থী না থাকা এলাকায় ভালো ও জনকল্যাণকামী ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন: সীমিত পরিসরে লড়াইয়ের প্রস্তুতিস্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। আগ্রহী প্রার্থীদের কেন্দ্রে নাম জমা দিতে বলা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হবে।ঢাকা দক্ষিণে দলের মহানগর আমির মাওলানা মুহাম্মদ হোসেন আকন্দকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে সারা দেশে সব জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা নেই দলটির। সাংগঠনিক সক্ষমতা ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে চায় তারা।দলটির মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে ১১ দলের প্রত্যেকে নিজেদের ব্যানারে নির্বাচন করবে। সেভাবেই তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্বাচনে দলটির প্রার্থী না থাকলে জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকবে। এ ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক, দ্বীনদার, নীতিবান ও যোগ্য প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি।নেজামে ইসলাম পার্টি: বড় পরিকল্পনা নেইস্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক কোনো পরিকল্পনা নেই নেজামে ইসলাম পার্টির। তবে সক্ষমতা বিবেচনায় কিছু এলাকায় প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা রয়েছে দলটির।স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহীদের প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কেউ কেউ কাজও শুরু করেছেন। পরে কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।নিজস্ব প্রার্থী না থাকা এলাকায় বন্ধুত্বপূর্ণ দল বা সমঝোতার ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সমঝোতা না হলে সৎ, দেশপ্রেমিক ও জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এমন প্রার্থীদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে দলটি।দলটির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে তাঁদের ব্যাপক পরিকল্পনা নেই। বরং পরবর্তী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই তাঁদের মূল পরিকল্পনা রয়েছে।প্রতীকবিহীন নির্বাচন কতটা সুবিধা দেবে?ইসলামি দলগুলোর নির্বাচনি প্রস্তুতিতে একটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকা। দলগুলোর নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, এতে জাতীয় রাজনীতির প্রতীকনির্ভর প্রভাব কিছুটা কমতে পারে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক শক্তি গুরুত্ব পাবে।তবে প্রার্থী বাছাই, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা, ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং নির্বাচনি সমঝোতা এসবই দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।সব মিলিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তুলনামূলকভাবে সক্রিয় প্রস্তুতিতে রয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম প্রার্থী চূড়ান্তের কাজ করছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সীমিত পরিসরে নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, আর খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি এখনো চূড়ান্ত নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে।স্থানীয় নির্বাচনে এসব দলের প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত কতটা ভোটে প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে প্রার্থী বাছাই, মাঠপর্যায়ের প্রচার, পারস্পরিক সমঝোতা এবং নির্বাচনি পরিবেশের ওপর।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত