প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
সৈয়দপুরে রেলের ৫০ কোটি টাকার জমি দখলের চেষ্টা, জনতার প্রতিরোধে পিছু হটল চক্র
শাহজাহান আলী মনন, , সৈয়দপুর প্রতিনিধি:: ||
নীলফামারীর সৈয়দপুরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে রেলওয়ের একটি বাংলোসহ প্রায় ১ একর ১০ শতক জমি দখলের চেষ্টা চালিয়েছে একটি চক্র। তবে সংবাদকর্মী, রেলওয়ে শ্রমিক নেতা ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। দখলের জন্য আনা টিনের চালা ও বাঁশের খুঁটি ফেলে ঘটনাস্থল থেকে সরে যায় দখলকারীরা।রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে শহরের পাঁচমাথা মোড়সংলগ্ন শহীদ ক্যাপ্টেন সামসুল মৃধা সড়ক (বিমানবন্দর রোড) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।জানা যায়, ওই স্থানে সৈয়দপুর রেলওয়ের ভূসম্পত্তির আওতাধীন ১১০ নম্বর বাংলো রয়েছে। বাংলোটির আশপাশে রয়েছে প্রায় ১ একর ১০ শতক জমি। স্থানীয়দের দাবি, জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে দীর্ঘদিন আগে জায়গাটি লিজ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।তবে পরিত্যক্ত বাংলো ও জমিটি দখলে নিতে বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী মহল চেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ১৭ বছর ধরে জায়গাটি ‘বিটস কোচিং সেন্টার’-এর সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দখলে রাখা হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে আগের দখলদাররা সরে গেলে নতুন করে কয়েকটি পক্ষ জায়গাটি দখলের চেষ্টা শুরু করে।এরই ধারাবাহিকতায় রোববার ভোরে সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রানা নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশতাধিক যুবক সেখানে টিনের চালা ও বাঁশের খুঁটি নিয়ে আসে। তারা জায়গাটি ঘিরে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলে খবর পেয়ে সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রানা দাবি করেন, পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগ থেকে তাকে কমার্শিয়াল লিজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে মার্কেট নির্মাণের জন্য জায়গাটি দখলে নেওয়া হচ্ছে।তবে লিজের কাগজ দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয়, পার্বতীপুর ও পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।এ খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন।এ সময় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নুর মোহাম্মদ, সৈয়দপুর রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের প্রকৌশলী (এইএন) তৌহিদুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।রেল কর্মকর্তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে দখল করতে আসা লোকজন দ্রুত সরে যায়। লিজের কাগজ দেখানোর জন্য রানা’কে খোঁজা হলেও তখন তাকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দখলের জন্য আনা টিনের চালা ও বাঁশের খুঁটি জব্দ করে। একই সঙ্গে জায়গাটি রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে উল্লেখ করে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।ঘটনাটি নিয়ে সৈয়দপুর শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর ফরহাদ হোসেন বলেন, বৈধ লিজ থাকলে রেলওয়ের ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জায়গা বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। তাদের অনুপস্থিতিতে দলীয় কর্মী ও ব্যক্তিগত লোকজন নিয়ে এভাবে দখলে আসা ঠিক হয়নি। একই জায়গা যদি শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বরাদ্দ থাকে, তাহলে সেটি অন্য কাউকে কীভাবে লিজ দেওয়া হলো—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।বাংলাদেশ রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সৈয়দপুর কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিনিধি আবু হাসান বলেন, জায়গাটি ট্রাস্টের বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। দীর্ঘদিন একটি গোষ্ঠী অবৈধভাবে জায়গাটি ভোগদখল করে রেখেছিল। এখন আর কাউকে সেখানে দখল করতে দেওয়া হবে না।সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজওয়ান আক্তার পাপ্পু বলেন, বিএনপি বা অঙ্গসংগঠনের নাম ব্যবহার করে কেউ বেআইনি দখলবাজিতে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।অন্যদিকে, রানা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, পাকশী রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা তাকে লিজ দেওয়ার সময় জায়গাটি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাদের কথামতোই তিনি প্রস্তুতি নিয়ে সেখানে যান। তবে কর্মকর্তারা উপস্থিত না হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়। তার দাবি, তিনি বৈধ লিজের ভিত্তিতেই সেখানে মার্কেট নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন।সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নুর মোহাম্মদ বলেন, রানার লিজের কাগজ সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে। তবে তিনি কাগজ দেখাতে পারেননি এবং পরে তাকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে বিভাগীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর লিজটি ভুয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও প্রতারণার মামলা করা হবে।
রেলওয়ের বিপুলমূল্যের এই সম্পত্তি নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দখলের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত