প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুড়িগ্রামে বিনামূল্যে থেরাপিতে বদলাচ্ছে প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ মানুষের জীবন
মোঃ মাজহারুল ইসলাম, , কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:: ||
কুড়িগ্রামে সরকারি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে চিকিৎসা, থেরাপি, পরীক্ষা, পরামর্শ ও সহায়ক উপকরণ পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এ কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, স্ট্রোক, ব্যথাজনিত সমস্যা, কথা বলা ও শোনার সমস্যা নিয়ে সেবা নিতে আসছেন।কুড়িগ্রাম শহরের মধুরমোড়-নিমবাগান এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা চিকিৎসা ও থেরাপি নিতে এসেছেন।উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে শিশু সন্তান আবু বক্করকে নিয়ে এসেছেন মজনু ইসলাম। শিশুটি কথা বলতে পারে না। কানে শোনার কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা জানতে কেন্দ্রে তার শ্রবণ পরীক্ষা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ ধরনের পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে সরকারি এ কেন্দ্রে পরীক্ষাটি বিনামূল্যেই করা হয়।প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে পাওয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে শিশুটির কানে উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কথা বলার সক্ষমতা বাড়াতে তাকে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির আওতায় নেওয়া হয়েছে।কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, এখানে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ, প্রতিবন্ধিতার ধরন ও মাত্রা নির্ণয়, ফিজিওথেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, কাউন্সেলিং, এনডিডি কর্নার, মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে সেবা, সহায়ক উপকরণ বিতরণ, রেফারেল ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে স্ট্রোক, কোমর, ঘাড়, হাত-পা ও বিভিন্ন ব্যথাজনিত সমস্যায় শারীরিক নড়াচড়া ও কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির মাধ্যমে কথা বলা ও যোগাযোগের সমস্যায় সহায়তা করা হয়। অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করা হয়।এ ছাড়া শ্রবণ পরীক্ষার মাধ্যমে কানে শোনার মাত্রা নির্ণয়, দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের সমস্যা শনাক্ত, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগী ও অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং এনডিডি কর্নারের মাধ্যমে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি বা স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যায় প্রয়োজনীয় সেবা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমেও বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।কেন্দ্র সূত্র আরও জানায়, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জনকে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ধরনের সেবা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ১০০ থেকে ১২০ ধরনের সেবা নিচ্ছেন। মাসিক হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০টি সেবা।রাজারহাট উপজেলার ফরকেরহাট এলাকা থেকে কোমরের ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসা মোছা. বিবিজন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন তিনি। বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ সেবন করেও তেমন উপকার পাননি। পরিচিতদের পরামর্শে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে এসে বিনামূল্যে বিভিন্ন থেরাপি ও চিকিৎসা নেওয়ার পর আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। কেন্দ্রের পরিবেশ ও সেবার ব্যবস্থাপনাতেও সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।ঘাড়ের ব্যথার চিকিৎসা নিতে আসা নুর ইসলাম বলেন, নিয়মিত থেরাপি নেওয়ার পর তার ব্যথা আগের তুলনায় কমেছে। সরকারি এ কেন্দ্রে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় থেরাপি ও পরামর্শ পাওয়ায় তার মতো অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।ছিনাই ইউনিয়ন থেকে আসা হাসান আলী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও থেরাপিস্টরা রোগীর সমস্যা শুনে পরামর্শ দেন এবং থেরাপি দেন। দূর এলাকা থেকে এলেও এখানে সেবা পাওয়ায় তাদের অনেক সুবিধা হচ্ছে।অফিস সূত্রে জানা গেছে, শুধু চিকিৎসা ও থেরাপি নয়, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক উপকরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০টি হুইলচেয়ার, ১৫ থেকে ১৮টি তিন চাকার সাইকেলসহ শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত অনেক মানুষকে শ্রবণযন্ত্র দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে সমাজসেবা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও রয়েছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনামূল্যে চিকিৎসা, থেরাপি, পরীক্ষা, পরামর্শ ও সহায়ক উপকরণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পক্ষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত থেরাপি বা পরীক্ষা করানোর ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য সরকারি এই সেবা আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করছে।তবে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল সংকট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কনসালট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট, থেরাপি সহকারী, টেকনিশিয়ান ও স্টাফসহ মোট সাতজন জনবল দিয়ে বর্তমানে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ও কনসালট্যান্ট ফিজিওথেরাপি ডা. মো. আরিফুর রহমান বলেন, দিন দিন এ সেবায় মানুষের চাপ বাড়ছে। রোগী আসার পর প্রাথমিকভাবে প্রতিবন্ধিতার ধরন ও মাত্রা নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া হয়। একজন রোগীর নিবন্ধন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সেবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপের তুলনায় জনবল কম থাকায় কিছুটা সংকট রয়েছে। জনবল বাড়ানো গেলে আরও ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।এদিকে সম্প্রতি কুড়িগ্রাম প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রকে ঘিরে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে ডা. মো. আরিফুর রহমান বলেন, সরকারি সেবামূলক কার্যক্রম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে বর্তমান বা সাবেক কোনো কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি এসব সেবা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে আরও বেশি তথ্য পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রত্যন্ত এলাকার অনেক রোগী এখনো এসব সেবার সুযোগ সম্পর্কে জানেন না। একই সঙ্গে কোনো অনিয়ম বা অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।সেবার পরিধি আরও বাড়ানো, প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা গেলে কুড়িগ্রামের আরও বেশি মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনমূলক সেবার আওতায় আসতে পারবেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত