প্রিন্ট এর তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুরুতে নীরব, পরে ভয়ংকর হতে পারে ফ্যাটি লিভার
চেকপোস্ট নিউজ, ||
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলেও অনেকের শরীরে শুরুতে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ কারণেই ফ্যাটি লিভারকে অনেক সময় ‘নীরব রোগ’ বলা হয়। অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেকেই জানতে পারেন, তাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমেছে।চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফ্যাটি লিভারকে এখন অনেক ক্ষেত্রে স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বলা হয়। বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত সবচেয়ে সাধারণ ধরনটির নাম মেটাবলিক ডিফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD)।অতিরিক্ত ওজন, পেটের মেদ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মতো সমস্যার সঙ্গে এই রোগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারেফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, অনেকের কোনো উপসর্গই থাকে না। কারও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় লিভারের এনজাইমে পরিবর্তন ধরা পড়ে, আবার কারও আল্ট্রাসনোগ্রামে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি দেখা যায়।তাই শরীরে ব্যথা বা অস্বস্তি নেই বলে লিভার পুরোপুরি সুস্থ এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগছে?ফ্যাটি লিভারে কারও কারও দীর্ঘদিন ক্লান্তি বা দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে ক্লান্তির আরও অনেক কারণ রয়েছে—যেমন ঘুমের ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা, মানসিক চাপ, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো অসুস্থতা।তাই দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।ডান পাশে পেটে অস্বস্তি?লিভার শরীরের ডান দিকের ওপরের অংশে থাকে। ফ্যাটি লিভারে কারও কারও সেখানে মৃদু ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। তবে এটি ফ্যাটি লিভারের নির্দিষ্ট লক্ষণ নয়।ডান দিকের ওপরের পেটে নিয়মিত ব্যথা বা অস্বস্তি হলে নিজের মতো করে ফ্যাটি লিভার ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।অকারণে ওজন কমছে?ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক পর্যায়ে অকারণে ওজন কমে যাওয়া সাধারণ লক্ষণ নয়। তবে রোগটি অগ্রসর হয়ে লিভারের গুরুতর ক্ষতি হলে ওজন কমে যেতে পারে।চেষ্টা না করেও ওজন কমতে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে এর সঙ্গে দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা বা অন্য শারীরিক পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।চোখ-ত্বক হলুদ হলে সতর্কচোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া জন্ডিসের লক্ষণ। এটি সাধারণ ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক লক্ষণ নয়। তবে লিভারের রোগ গুরুতর পর্যায়ে গেলে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।জন্ডিসের সঙ্গে পেট ফুলে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, তীব্র দুর্বলতা বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।পেট ও পা ফুলে যেতে পারেলিভারের গুরুতর ক্ষতি হলে শরীরে তরল জমে পেট ফুলে যেতে পারে। একইভাবে পা বা গোড়ালিও ফুলে যেতে পারে।এসব লক্ষণ সাধারণ ফ্যাটি লিভারের তুলনায় উন্নত পর্যায়ের লিভার রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই অস্বাভাবিকভাবে পেট বা পা ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।কারা বেশি ঝুঁকিতে?ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে যাদের—অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছেকোমর ও পেটের চারপাশে অতিরিক্ত মেদ রয়েছেটাইপ-২ ডায়াবেটিস রয়েছেইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স রয়েছেরক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বেশিকোলেস্টেরল বেশিউচ্চ রক্তচাপ রয়েছেমেটাবলিক সিনড্রোম রয়েছেপলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) রয়েছেথাইরয়েড কম সক্রিয়শারীরিক পরিশ্রম কমএসব ঝুঁকি থাকলে কোনো উপসর্গ না থাকলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।শুধু মোটা হলেই ফ্যাটি লিভার হয়?না। অতিরিক্ত ওজন ফ্যাটি লিভারের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও MASLD হতে পারে।ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা থাকলেও লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।তাই শুধু শরীরের গঠন দেখে লিভারে চর্বি জমেছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না।কীভাবে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে?ফ্যাটি লিভার অনেক সময় অন্য কোনো কারণে করা পরীক্ষায় ধরা পড়ে। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ওজন, রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বিবেচনা করেন।প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা ও ইমেজিং করা হয়। লিভার ফাংশন টেস্টে ALT ও AST-এর মতো এনজাইম পরীক্ষা করা হতে পারে।তবে এসব এনজাইম স্বাভাবিক থাকলেও ফ্যাটি লিভার থাকতে পারে। তাই শুধু রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেই লিভার পুরোপুরি সুস্থ এমনটা বলা যায় না।আল্ট্রাসনোগ্রামে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি দেখা যেতে পারে। আবার FibroScan বা অন্য ধরনের ইলাস্টোগ্রাফির মাধ্যমে লিভারে ফাইব্রোসিস বা শক্তভাব তৈরি হয়েছে কি না মূল্যায়ন করা যায়।ফ্যাটি লিভার হলে ওষুধই কি যথেষ্ট?সব ক্ষেত্রে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করা যায় না। ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় জীবনযাপনের পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সেগুলোও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক ওষুধ বিবেচনা করতে পারেন। বিশেষ করে MASH ও উল্লেখযোগ্য লিভার ফাইব্রোসিস থাকলে নির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। এসব ওষুধ সবার জন্য নয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।ওজন কমালে কমবে লিভারের চর্বি?অনেক ক্ষেত্রেই ওজন কমালে লিভারের চর্বি ও প্রদাহ কমতে পারে। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো ফ্যাটি লিভারের অবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তবে খুব দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ও টেকসইভাবে ওজন কমানো ভালো।খাবারে কী পরিবর্তন আনবেন?ফ্যাটি লিভার থাকলে খাবারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেনশাকসবজিপরিমিত ফলপূর্ণ শস্যস্বাস্থ্যকর চর্বিপরিমিত প্রোটিনঅন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয়, পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো ভালো।কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি চা-কফি ও অন্যান্য চিনিযুক্ত পানীয় নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।ব্যায়াম কতটা জরুরি?শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমও প্রয়োজন। হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য ব্যায়াম করা যেতে পারে।দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করে থাকলে হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করা ভালো।অ্যালকোহল না খেলেও ফ্যাটি লিভার হয়?হ্যাঁ। ফ্যাটি লিভার শুধু অ্যালকোহল পানকারীদের রোগ নয়। MASLD-এর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ কোলেস্টেরল ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।তাই অ্যালকোহল পান না করলেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।ফ্যাটি লিভার কি পুরোপুরি ভালো হয়?প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভারের অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখলে লিভারের চর্বি ও ক্ষতি কমানো যেতে পারে।তবে লিভারে গুরুতর সিরোসিস তৈরি হলে সেটি আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসা সাধারণত সম্ভব নয়। তাই যত দ্রুত রোগ শনাক্ত করা যায়, তত ভালো।কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?নিচের যেকোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—দীর্ঘদিন অস্বাভাবিক ক্লান্তিডান দিকের ওপরের পেটে নিয়মিত অস্বস্তিঅকারণে ওজন কমে যাওয়াচোখ বা ত্বক হলুদ হওয়াপেট বা পা ফুলে যাওয়াডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলতাআল্ট্রাসনোগ্রামে ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ালিভার ফাংশন পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফলবিশেষ করে চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, পেট দ্রুত ফুলে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা গুরুতর দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।শেষ কথাফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি অনেক সময় নীরবে শুরু হয়। তাই ব্যথা বা অস্বস্তি নেই বলে লিভার সম্পূর্ণ সুস্থ, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।অতিরিক্ত ওজন, পেটের মেদ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড থাকলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করা যেতে পারে।সবচেয়ে আশার কথা হলো, শুরুতেই শনাক্ত হলে ফ্যাটি লিভারের অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি সম্ভব। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে ওজন, খাবার, শারীরিক কার্যক্রম এবং রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রার দিকে নজর রাখুন।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত