প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
কোটা আন্দোলন যেভাবে রূপ নেয় সরকার পতনে
চেকপোস্ট নিউজ:: ||
সরকারি
চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮
সালের কোটা বাতিলের সরকারি সার্কুলারকে অবৈধ ঘোষণা করে। রায়ের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা ৫৬ শতাংশ কোটা
বাতিল করে নতুন নির্বাহী আদেশের দাবি জানায়। সরকার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও
শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।৬ জুন হাইকোর্টের রায়ের
প্রতিবাদে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, জগন্নাথ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হয়। পরে ঈদুল আজহার ছুটিতে আন্দোলনে
সাময়িক বিরতি পড়ে।১ জুলাই ২৪ দিনের বিরতি
শেষে আবার রাজপথে ফেরে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে
নতুন নির্বাহী আদেশের দাবিতে বিক্ষোভ করে ৪ জুলাই পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়া হয়। ২
জুলাই ঢাকায় এক ঘণ্টা শাহবাগ অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল শেষে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কও অবরোধ করে। ৩
জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা
শাহবাগ অবরোধ করে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৪
জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় কার্যত কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের
সার্কুলার অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে সারাদেশে আন্দোলন আরও বেগ পায়।৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দেশজুড়ে অবস্থান, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি
পালিত হয়। ৭ জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে ৬ জুলাই নতুন কর্মসূচি
দেয়া হয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ
বিভিন্ন ক্যাম্পাসেও একই কর্মসূচি পালিত হয়।৬ জুলাই বাংলা ব্লকেডের
প্রথম দিনে রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, মিন্টো রোডসহ
গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।
দিন শেষে সংসদে আইন করে সব গ্রেডে অযৌক্তিক কোটা বাতিলের এক দফা দাবিতে কর্মসূচি
অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। ৭ জুলাই বাংলা ব্লকেডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে
রাজধানী। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচিও পালন করে
শিক্ষার্থীরা। ৮ জুলাই রাজধানীর ১১টি স্থানে অবরোধ, দেশের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিক্ষোভ এবং ছয়টি মহাসড়ক ও তিনটি রেলপথে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।৯ জুলাই সড়ক ও রেলপথে
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধের ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই দিন
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। ১০
জুলাই আপিল বিভাগ চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করে। তবে শিক্ষার্থীরা সব গ্রেডে
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। ১১ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকে আদালতের বিরুদ্ধে অবস্থান বলে মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আন্দোলনকারীদের সীমা অতিক্রমের অভিযোগ তোলেন। অন্যদিকে
শিক্ষার্থীরা রাজধানী ও মহাসড়কে অবরোধ অব্যাহত রাখে।১২ জুলাই শাহবাগে আবারও
অবরোধ গড়ে তোলে শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা
চালায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। ভিডিও ধারণ করায় এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাও
ঘটে। ১৩ জুলাই ছুটির দিনেও আন্দোলন থামেনি। ঢাকায় শাহবাগ এবং রাজশাহীতে রেললাইন
অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। পরে সংবাদ সম্মেলনে মামলা দিয়ে আন্দোলন দমনের অভিযোগ তুলে
পরদিন রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।রবিবার ১৪ জুলাই
শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন। সন্ধ্যায় গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে
শেখ হাসিনার রাজাকারের সন্তান মন্তব্য আন্দোলনে নতুন মোড় আনে। রাতেই ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ছাত্রীদের হলের তালা ভেঙেও অনেকে
মিছিলে যোগ দেয়। একইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৪জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত ১৩ আন্দোলনকারী আহত হন।
জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।সোমবার ১৫ জুলাই
ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর
ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত ৩০০ জন আহত হন। সন্ধ্যায় হেলমেটধারী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকে আহত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় এবং
অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করে। পরে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল,
ফজলুল হক হল ও অমর একুশে হলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। রাজশাহী ও কুমিল্লাতেও হামলার ঘটনা
ঘটে।মঙ্গলবার ১৬ জুলাই
সারাদেশে সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হন। আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ভিডিও
ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। রাতেই শিক্ষার্থীরা ঢাকা ও রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগকে সরিয়ে দেয়। সরকার স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ
ঘোষণা করে। পরদিন গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের ডাক দেয়া হয়।বুধবার ১৭ জুলাই
বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে সরিয়ে ক্যাম্পাসকে রাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
গায়েবানা জানাজায় বাধা দেয় পুলিশ। শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে শেখ হাসিনা বিচার বিভাগীয়
তদন্তের ঘোষণা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অপেক্ষা করতে বলেন। শিক্ষার্থীরা পরদিন
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই
দেশজুড়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। অন্তত ২৯ জন নিহত হন
এদিন। আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা
চালানো হয়। মীর মুগ্ধের মৃত্যু নাড়িয়ে দেয় পুরো দেশের মানুষকে। বিটিভি, সেতু ভবনসহ
বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ইন্টারনেট বন্ধ এবং মেট্রোরেল
চলাচল স্থগিত করা হয়। ৪৭ জেলায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিজিবি মোতায়েন করা হয়।শুক্রবার ১৯ জুলাই
মধ্যরাতে সারাদেশে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। নরসিংদী কারাগার,
মেট্রোরেল স্টেশনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। মিরপুর-১০, কাজীপাড়া
ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ঢাকায় অন্তত ৪৪ জন এবং দেশের বিভিন্ন
জেলায় আরও বহু মানুষ নিহত হন। শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারাও
আন্দোলনে যোগ দেন। রাজশাহীতে শিক্ষকরা প্রতিবাদ করেন। নরসিংদী কারাগার ভেঙে
বন্দিদের মুক্ত করা হয়। রাতেই সারাদেশে কারফিউ ও পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট
কার্যকর করে দেয়া হয়।শনিবার ২০ জুলাই
কারফিউর প্রথম দিনেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এদিন অন্তত ২৬ জন নিহত হন। সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ
বহাল রেখে দুই দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের
পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে
যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।রবিবার ২১ জুলাই
সুপ্রিম কোর্ট কোটা মামলার চূড়ান্ত রায়ে ৯৩ শতাংশ সরকারি চাকরি মেধার ভিত্তিতে
উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়। অবশিষ্ট কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৫
শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ২ শতাংশ সংরক্ষণ করা
হয়। একই দিন ৫৬ সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতিতে আন্দোলন আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
তারা জানায় কয়েকজন সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে জোরপূর্বক বিবৃতি দেয়ানোর চেষ্টা করা
হয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য উদ্বেগ প্রকাশ করলে তিন বাহিনীর
প্রধানরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। কারফিউ চলতে থাকে।সোমবার ২২ জুলাই আগের
দিনের সংঘর্ষে আহত আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতের
রায়ের আলোকে কোটা সংস্কারের গেজেট অনুমোদন দেন। একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতকে কঠোর
হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। গ্রেপ্তার অভিযানও অব্যাহত থাকে। মঙ্গলবার ২৩ জুলাই সরকার নতুন
কোটা সার্কুলার জারি করলেও আন্দোলনের সমন্বয়করা তা প্রত্যাখ্যান করে। কারফিউর
মধ্যেও গ্রেপ্তার অভিযান চলতে থাকে। এদিন ধাপে ধাপে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু
করা শুরু হয়।বুধবার ২৪ জুলাই
আন্তঃজেলা বাস-লঞ্চ চলাচল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আংশিক স্বাভাবিক করা হয়। পাঁচ
দিন নিখোঁজ থাকার পর সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বকর মজুমদার ও রিফাত রশিদের সন্ধান
মেলে। পরে জানা যায় চোখ বেঁধে আটকে রাখা হয়েছিল তাদের এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে
তাদের আলাদাভাবে ফেলে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই জাপা নেতা আন্দালিব রহমান
পার্থসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে
দেয়া হয়। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দমন অভিযান বন্ধের আহ্বান
জানায়। শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল স্টেশন পরিদর্শন করেন। আন্দোলনের
সমন্বয়করা জানায় সংসদে আইন না হওয়ায় কোটা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।শুক্রবার ২৬ জুলাই
দেশজুড়ে ব্লক রেইড জোরদার করা হয়। শত শত মামলা ও হাজারো গ্রেপ্তারের মধ্যে ডিবি
নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ ও আবু বকর মজুমদারকে আবারও তুলে নিয়ে যায়। জাতিসংঘ দমন
অভিযান বন্ধ ও পূর্ণ ইন্টারনেট পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানায়। শনিবার ২৭ জুলাই ডিবি
আরও দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে হেফাজতে নেয়। সবমিলিয়ে গ্রেপ্তার
সংখ্যা নয় হাজার ছাড়িয়ে যায়। ১৪টি পশ্চিমা দেশের কূটনৈতিক মিশন জবাবদিহির আহ্বান
জানায়। শেখ হাসিনা পঙ্গু হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান।রবিবার ২৮ জুলাই
সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকে ডিবি হেফাজতে নেয়া হয়। রাতে ডিবি কার্যালয় থেকে ছয়
সমন্বয়কের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়। তবে বাইরে থাকা
সমন্বয়করা দাবি করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ওই বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
তারা অন্যান্যদের নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এদিন মোবাইল ইন্টারনেট
ফিরলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকে। সরকার প্রথমবারের মতো নিহতের সরকারি
সংখ্যা প্রকাশ করে।সোমবার ২৯ জুলাই
ছাত্রনেতাদের মুক্তি না দেয়ায় দেশজুড়ে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার
জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধের দাবি তোলে। ডিবিতে সমন্বয়কদের উপস্থাপন নিয়ে হাইকোর্ট
অসন্তোষ প্রকাশ করে। দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গণগ্রেফতার বন্ধ ও আটক
শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতে সমাবেশ করে এবং আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায়। সরকার
ঘোষিত শোক দিবস প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রতিবাদ হিসেবে মুখ
ও চোখে লাল ব্যান্ড পরে অনলাইন প্রচারণার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।মঙ্গলবার ৩০ জুলাই
সরকার সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন করলেও তা প্রত্যাখ্যান করে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল ছবি লাল
করে দেয় আন্দোলনের সমর্থকরা এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে। এসময় ছয়
সমন্বয়ক তখনও ডিবি হেফাজতে ছিলেন। তাদের মুক্তি না দিলে এইচএসসি পরীক্ষা বর্জনের
ঘোষণা দেয় শত শত পরীক্ষার্থী। পুলিশি বাধার মধ্যেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মৌন মিছিল, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ এবং শিশু হত্যার
প্রতিবাদে অভিভাবকদের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট নাগরিকরা প্রাণহানির দায়
সরকারের ওপর চাপায়। শেখ হাসিনা বিচার বিভাগীয় তদন্তে বিদেশি সহায়তা নেয়ার কথা
জানান। একই সঙ্গে দেশজুড়ে গ্রেপ্তার অভিযানও চলতে থাকে।বুধবার ৩১ জুলাই হত্যা,
গণগ্রেপ্তার, গুম ও দমন-পীড়নের প্রতিবাদে সারাদেশে মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি পালন
করে শিক্ষার্থীরা। নয় দফা দাবিতে আদালত প্রাঙ্গণ, ক্যাম্পাস ও রাজপথে বিক্ষোভ শুরু
হয়। ঢাকায় বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা
হাইকোর্ট অভিমুখে মিছিল করলে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সামনে পুলিশ বাধা দেয় এবং
কয়েকজনকে আটক করে। পরে দোয়েল চত্বরে নতুন করে সমাবেশ হয় যেখানে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও যোগ দেয়। চট্টগ্রামেও আদালত প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের
কর্মসূচিতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা সংহতি জানায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করলে পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। এদিন ১৩ দিন
পর ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবার চালু হয়।বৃহস্পতিবার ১ আগস্ট
সরকার জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনকে সন্ত্রাসবিরোধী
আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই দিনে জাতিসংঘ বাংলাদেশে সহিংসতা তদন্তে স্বাধীন
ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তি পায়
আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক। তাদের মুক্তির পর দেশজুড়ে গণমিছিল ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
হয়।শুক্রবার ২ আগস্ট
নিহতদের বিচারের দাবিতে আবারও উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে
আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আরও দুজন নিহত হন। আন্দোলনকারীরা রবিবার ৪
আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য আবারও বন্ধ
করে দেয়া হয় ফেসবুক। মুক্তি পাওয়া ছয় সমন্বয়ক জানায় ডিবি কার্যালয়ে দেয়া কর্মসূচি
প্রত্যাহারের বক্তব্য স্বেচ্ছায় ছিল না। এদিন চলমান মামলায় গ্রেপ্তার ৭৮ এইচএসসি
পরীক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে জামিন পান। একইদিন ইউনিসেফ জানায় জুলাইয়ের
আন্দোলনে অন্তত ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।শনিবার ৩ আগস্ট
আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায়। কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন সরকারের সঙ্গে
আর কোনো সংলাপ নয়। শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে জাতীয়
সরকার গঠনের দাবিতে কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ঘোষণা আসে। শেখ হাসিনার সংলাপের
প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাহিদ
ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার
পদত্যাগ। একই সঙ্গে রবিবার ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়।
এদিন চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবন ও সংসদ সদস্য
মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গাজীপুরের শ্রীপুরে
পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষে একজন নিহত হন। রংপুরে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই পুলিশ
সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সিলেটে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে শতাধিক
মানুষ আহত হয়।রবিবার ৪ আগস্ট
আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন। ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২১ জেলায় প্রায় ৯১ জন নিহত
হন। এ সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলেই ধারণা করা হয়। সারা দেশে প্রধান সড়ক অবরোধকে
কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে
পড়ে। কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও গুলির ঘটনা ঘটে। নতুন করে মোবাইল ইন্টারনেট
বন্ধ করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করে সরকার। এদিন শেখ
হাসিনা আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সরকার পতনের
লক্ষ্যে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ জনগণকে কারফিউ মেনে
চলার আহ্বান জানায়। একই সময়ে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন সশস্ত্র বাহিনী
সবসময় জনগণের পাশে রয়েছে।সোমবার ৫ আগস্ট আন্দোলনের
চূড়ান্ত দিন। কারফিউ অমান্য করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ ঢাকার
পথে রওনা দেয়। মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে রাজধানীমুখী জনস্রোত তৈরি হয়। দুপুরের
মধ্যেই আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের সামনে পৌঁছে যায়।
বিকেলে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন শেখ হাসিনা।
পরে তার বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক বিমানে ভারত পালিয়ে যান। একইদিন
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেন এবং
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর গণভবনে প্রবেশ করে জনতা। রাজধানীজুড়ে
শুরু হয় উদযাপন। সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে রাষ্ট্রপতি
দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় হাজারো প্রাণের
বিনিময়ে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করে ছাত্র-জনতা। পায় এক নতুন বাংলাদেশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত