প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬
তিস্তার চরে অসুস্থতা মানেই জীবন-মৃত্যুর লড়াই নেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স
মেহেদি হাসান মুরাদ, , গংগাচড়া প্রতিনিধি:: ||
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চলে অসুস্থতা মানেই শুরু হয় জীবন বাঁচানোর কঠিন লড়াই। জরুরি মুহূর্তে নেই অ্যাম্বুলেন্স, নেই পাকা সড়ক, নেই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। ফলে চেয়ার, জলচৌকি কিংবা খাটিয়াই হয়ে ওঠে চরবাসীর একমাত্র ‘অ্যাম্বুলেন্স’।গভীর রাতে প্রসবব্যথায় কাতর এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে স্বজনরা বাঁশের সঙ্গে চেয়ার বেঁধে কাঁধে করে নদীর ঘাটে নিয়ে যান। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে শুরু হয় হাসপাতালের পথে আরেক দফা দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় ঝরে যায় প্রাণ, কখনো হারিয়ে যায় অনাগত সন্তানও।গঙ্গাচড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টির বিস্তীর্ণ এলাকা তিস্তা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চল। হাজারো মানুষের বসবাস হলেও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, গুরুতর অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে অনেক এলাকায় নদীর ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার মতো সড়কও নেই।সম্প্রতি এক অসুস্থ বৃদ্ধকে কাঠের চেয়ারে বসিয়ে বাঁশ ও দড়ি দিয়ে কাঁধে বহন করে নদীর ঘাটে নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে চরবাসীর ভাষায়, এটি ব্যতিক্রম নয়; বরং তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। এর আগে গত ২৬ জুন দ্রুতগতির নৌযান না থাকায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যু হয় বলে স্থানীয়রা জানান।এই বাস্তবতায় নোহালী ইউনিয়নের ২, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কচুয়া সরদারপাড়াসহ তিস্তার মাঝের বিভিন্ন চর এলাকার প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি স্পিডবোট ও বেতনভুক্ত চালক নিয়োগের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।রোববার (৫ জুলাই) এলাকাবাসীর প্রতিনিধি মো. আল আমিন স্মারকলিপি জমা দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, চারদিকে নদী থাকায় উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌযান। কিন্তু সরকারি স্পিডবোট বা জরুরি রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় সংকটময় সময়ে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।নোহালী ইউনিয়নের বাসিন্দা লাল মিয়া বলেন, আমরা গরিব মানুষ। অসুখ হলে আগে ভাবি মানুষটাকে কীভাবে বাঁচাব। রাস্তা নেই, গাড়ি নেই। কাঁধে করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।একই এলাকার আব্দুস সালাম বলেন, বালুচর পেরিয়ে, নদী পার হয়ে হাসপাতালে নিতে নিতে অনেক রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। কেউ কেউ আর ফিরেও আসে না।কোলকোন্দ ইউনিয়নের এক নারী বলেন, গর্ভবতী মায়েদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। প্রসবব্যথা উঠলে নৌকা পাওয়া যায় না। তখন কাঁধে করেই নদীর ঘাটে নিতে হয়। অনেক সময় মা ও সন্তান দুজনকেই হারাতে হয়।এলাকাবাসীর প্রতিনিধি মো. আল আমিন বলেন, একটি স্পিডবোট অনেক সময় একটি প্রাণ বাঁচাতে পারে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুটি স্পিডবোট চালুর দাবি জানিয়েছি।গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলেমুল বাসার বলেন, তিস্তা চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, জরুরি রোগী দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।স্থানীয়দের দাবি, শুধু নোহালী ইউনিয়ন নয়, গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদীবেষ্টিত সাতটি চরাঞ্চলীয় ইউনিয়নের মানুষের জন্যও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা জরুরি। তাদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগই পারে চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত