প্রিন্ট এর তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
নীরব কণ্ঠে ৩০ বছরের সংগ্রাম: গোপালগঞ্জে পত্রিকা বিক্রি করে পরিবার চালান বাকপ্রতিবন্ধী জামিল
ছাইম খান,, টুঙ্গিপাড়া প্রতিনিধি:: ||
জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী হলেও জীবনসংগ্রামে কখনো হার মানেননি গোপালগঞ্জ শহরের পরিচিত মুখ জামিল শেখ। কথা বলতে না পারলেও সততা, পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাকে পুঁজি করে টানা ৩০ বছর ধরে মানুষের দোরগোড়ায় সংবাদপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। এই আয়েই চলছে তার পরিবার এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ।গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা জামিল শেখের বয়স প্রায় ৪০ বছর। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মাত্র ১০ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে পত্রিকা বিক্রির কাজ শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিদিন ভোরে কাঁধে পত্রিকার ব্যাগ নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়ান।পুলিশ লাইনস, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, বিভিন্ন দোকান ও বাসাবাড়িতে প্রতিদিন সংবাদপত্র পৌঁছে দেন তিনি। রোদ, বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তার কর্মস্পৃহাকে থামাতে পারেনি। কথা বলতে না পারলেও ক্রেতাদের চাহিদা সহজেই বুঝে নিয়ে মুহূর্তেই হাতে তুলে দেন কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা। নির্ভুল হিসাব-নিকাশের জন্যও তিনি সবার কাছে প্রশংসিত।তবে সময়ের সঙ্গে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রসারে ছাপা পত্রিকার চাহিদা কমে যাওয়ায় জামিলের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এরপরও তিনি কখনো কারও কাছে হাত পাতেননি; নিজের শ্রমের ওপর ভরসা রেখেই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।স্থানীয় সংবাদপত্র বিক্রয়কেন্দ্রের মালিক খালিদ হোসেন জানান, তিন দশক ধরে জামিল নিয়মিত তার প্রতিষ্ঠান থেকে পত্রিকা নিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে কখনো অসততা বা হিসাবের গরমিলের অভিযোগ ওঠেনি।স্থানীয়দের কাছেও জামিল একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও সংগ্রামী মানুষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তার উপার্জনের ওপরই নির্ভর করছে পরিবারের ব্যয় এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা।প্রেসক্লাব গোপালগঞ্জের সভাপতি মো. জুবায়ের হোসেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই জামিল নিজের পরিশ্রমে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে পত্রিকার বিক্রি কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। এমন একজন পরিশ্রমী মানুষের পাশে সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন।পরিবারের দাবি, একসময় জামিল সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও পরবর্তীতে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে।জামিলের মা শিরিয়া বেগম জানান, আগে তার ছেলে প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন। তবে কী কারণে সেই সুবিধা বন্ধ হয়েছে, তা তাদের জানা নেই। বর্তমানে জামিলের পত্রিকা বিক্রির আয়ই পরিবারের একমাত্র ভরসা।এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি এবং ভাতা কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি। জামিল বা তার পরিবারের সদস্যরা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে রেকর্ড যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।প্রতিকূলতাকে জয় করে সততা, আত্মসম্মান ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এগিয়ে চলা জামিল শেখ আজ শুধু একজন পত্রিকা বিক্রেতাই নন; তিনি অধ্যবসায়, আত্মনির্ভরতা ও জীবনের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনুপ্রেরণাদায়ক প্রতীক।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত