প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে দুদকের অনুসন্ধান
চেকপোস্ট নিউজ:: ||
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেসরকারি ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। ভুয়া কাগজপত্র ও নিয়মবহির্ভূত ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে ব্যাংকটির সাবেক ১৪৮ কর্মকর্তার নথি তলব করা হয়েছে।তদন্তের পরিধি ও নেতৃত্বদুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল অনুসন্ধান পরিচালনা করছে। দলে রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. কামিয়াব আফতাব-উন-নবী, মো. সোহাকুল ইসলাম এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসেন ও মো. সজিব আহমেদ। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।অনুসন্ধানে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী, সাবেক এমডি আব্দুল হামিদ মিয়া ও ওমর ফারুকসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।অনিয়মের চিত্রদুদকের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬৪ শতাংশ এককভাবে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। এসব ঋণের অধিকাংশের বিপরীতে কার্যকর কোনো জামানত ছিল না।বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে উঠে এসেছে যে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি নথি, কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান ও কৃত্রিম লেনদেন দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের সন্দেহ।২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ পরিদর্শনে ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে প্রায় ১৯ কোটি টাকার গরমিল ধরা পড়ে। ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও সে সময় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।ব্যাংকের পটভূমি২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা ইউনিয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছিল বলে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান। ব্যাংকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত সংগ্রহে সক্রিয় ছিল। পরে সেই আমানতের বড় অংশ বিভিন্ন ট্রেডিং ও শেল কোম্পানির নামে ঋণ হিসেবে বের করে নেওয়া হয়, যাদের অনেকের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকটিতে জনবল নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ২০২০ সালে এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে ওঠে। তিনি এস আলম পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রুপটির সরাসরি প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।দুদকের বক্তব্যদুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, অভিযোগসংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে দায়ীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।বিশেষজ্ঞদের মত ও পরবর্তী পদক্ষেপব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে একটি গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাতকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তাঁদের মতে, শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের নয়, ঋণ অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তদারকিতে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। দুদকের অনুসন্ধান শেষে এই কেলেঙ্কারি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত