প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
অভিযোগের পরই নিখোঁজ শিশু, হবিগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবার ঘিরে চাঞ্চল্য
শেখ বেলাল,, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:: ||
খাবার আত্মসাৎ, অনিয়ম ও নির্যাতনের অভিযোগ তোলার কয়েকদিনের মধ্যেই হবিগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবার থেকে উজ্জ্বল মিয়া নামে এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত ছয় দিন ধরে তার কোনো সন্ধান না মেলায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। একই সঙ্গে সরকারি শিশু পরিবারটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা, শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার থেকে উজ্জ্বল মিয়ার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় সরকারি শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষ হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে কাজ চলছে।সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে উজ্জ্বল মিয়ার একটি ভিডিও বক্তব্য। সেখানে সে সরকারি শিশু পরিবারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, খাবার আত্মসাৎ এবং মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর হঠাৎ করেই শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে।সূত্র জানায়, উজ্জ্বল মিয়াকে ২০১৭ সালে প্রায় পাঁচ বছর বয়সে লাখাই উপজেলার একটি সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে প্রথমে সিলেটের একটি সেফ হোমে রাখা হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তাকে হবিগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে স্থানান্তর করা হয়।ভিডিও বক্তব্যে উজ্জ্বল অভিযোগ করে, শিশুদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত মাছ ও মাংসের একটি অংশ বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তার দাবি, ১০ কেজি মাছ বা মাংস বরাদ্দ এলেও শিশুদের দেওয়া হয় অর্ধেকেরও কম। এছাড়া নিম্নমানের পোশাক বেশি দামে ক্রয় দেখিয়ে হিসাব করা হয় বলেও অভিযোগ তোলে সে।শুধু তাই নয়, এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘বড় ভাই’ পরিচয়ে কর্মরত এক কর্মচারী তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ করে উজ্জ্বল। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে তাকে “জেলে পাঠানো হবে” বলেও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল বলে দাবি তার।এদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। শিশুদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার, শৃঙ্খলার অভাব এবং মাদকাসক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক শিশুর হাতেই অবাধে মোবাইল ফোন দেখা যায়, যা কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।জানা গেছে, ১০০ আসনের এই সরকারি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাগজে-কলমে ৭১ জন শিশু রয়েছে। তাদের জন্য সরকারিভাবে মাথাপিছু মাসিক প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে খাবার, পোশাক, শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নিপুন রায়। তিনি বলেন, উজ্জ্বলের অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরং সে প্রায়ই কর্মচারী ও অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে অসদাচরণ করত।তিনি আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার দায়িত্বে থাকা এক কর্মচারীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনার পর উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে সে আর ফিরে আসেনি। এর আগেও একবার সে প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল এবং পরে একটি গাড়ি ওয়াশ সেন্টার থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাওন বলেন, আমরা নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আমি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। হবিগঞ্জে ফিরে এলে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।উজ্জ্বল মিয়ার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, শুধুমাত্র শিশুটিকে উদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারি শিশু পরিবারের সার্বিক অনিয়ম, শিশু নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা অন্যান্য শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতেরও জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশক
শেখ শাহাউর রহমান বেলাল
প্রধান সম্পাদক
আব্দুল হাকীম রাজ
কপিরাইট © ২০২৬ চেকপোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত