প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
জুলাই জাদুঘরে নিয়োগে সার্কুলারের আগেই গভীর রাতে হয় ভাইভা
||
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬২ পদে নিয়োগ দিতে গত ২৮ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দুদিন আগে (২৬ জানুয়ারি) থেকেই শুরু হয় ভাইভা পরীক্ষা। প্রচলিত আইন না মেনে সার্কুলারের আগেই গোপনে গভীর রাতে এই ভাইভা নেওয়া হয়। যাদের ভাইভা নেওয়া হয়েছিল তাদের কারোরই লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
জুলাই জাদুঘরে নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। ফলে বিতর্কের মুখে ভেস্তে যায় নিয়োগপ্রক্রিয়া। সে সময় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক এবং জুলাই জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর তানজিম ইবনে ওয়াহাব দাবি করেন, কাউকে গোপনে এমন পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। গণমাধ্যমে এ নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জুলাই জাদুঘরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়েও বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ ভিত্তিহীন।
তবে জুলাই জাদুঘরের এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত ও ভিডিও ফুটেজ পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। সেগুলো বিশ্লেষণ করে গোপনে ভাইভা আয়োজনের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আবেদনের সময় শেষ হওয়ার আগেই গোপনে ভাইভা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের ৬২ পদে নিয়োগের জন্য গত ২৮ জানুয়ারি ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ৯৬ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ভাইভা দিতে ডাকার সংবাদ প্রকাশের পর জুলাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষ দাবি করে, সংবাদমাধ্যমে আবেদনকারীদের ডাকার ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। তবে বাস্তবে কাউকে পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে বলা হয়, প্রাথমিক বাছাই এখনও শেষ না হওয়ায় কোনো প্রার্থীকে এসএমএস কিংবা ফোনকলের মাধ্যমে ডাকার তথ্য ভিত্তিহীন। ১০ হাজারের বেশি আবেদন পর্যালোচনা করে প্রার্থীদের মৌখিক ও দক্ষতা পরীক্ষণের জন্য ডাকা হবে।
কিন্তু এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদনের সময় দেওয়া হয়েছিল ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। অথচ গোপনে ভাইভা নেওয়া শুরু হয় ২৬ জানুয়ারি থেকে। অর্থাৎ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দুই দিন আগে থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। অফিস শেষে মধ্যরাত পর্যন্ত এই ভাইভা নেওয়া হয়। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের জন্য মাত্র সাত দিন সময় দেওয়া হয়। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের জন্য অন্তত ২১ দিন সময় দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২৮ জানুয়ারি সার্কুলার দেওয়া হলেও ভাইভা চলে ২৬ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। বিকেল ৫টায় জাদুঘরের নিয়মিত অফিস টাইম শেষ হলে প্রার্থীরা আসতে শুরু করেন। অফিস শেষে শুরু হওয়া ভাইভা চলত রাতে সাড়ে ১০টা থেকে শুরু করে ১২টা পর্যন্ত। এই পরীক্ষা নেওয়া হয় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তন ও সিনে কমপ্লেক্সে।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, অফিস শেষে মিলনায়তন ও সিনে কমপ্লেক্সের করিডোরে হাজির হন একদল ব্যক্তি। কেউ করিডোর দিয়ে প্রবেশ করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন। কেউ আগতদের কাগজ পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ একেকজনকে ভেতরে পাঠাচ্ছেন। কেউ ভেতর থেকে হাসিমুখে বের হয়ে আসছেন, কেউ করিডরে হাঁটাহাঁটি করছেন। কয়েকজন চা-নাশতা তৈরি করছেন। এদের মধ্যে কেউ জাদুঘরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাকিরা নিয়োগপ্রত্যাশী বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাদুঘর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া। এ জন্য সার্কুলারের আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে তাদেরকে আগে থেকেই বাছাইয়ের জন্য এই ভাইভা নেওয়া হয়। এই গোপন তৎপরতার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে সবকিছু অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করলেও সার্কুলারের আগেই ভাইভা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন মো. ফারুক নামের এক প্রার্থী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে আবেদন করেছিলাম। আমি ২৭ জানুয়ারি ভাইভা দিয়েছি, শাহবাগে জাদুঘরের ওইখানে নিয়েছিল। একট হলরুমে বসেছিলাম, বিকেল ৩টার পর ভাইভা শুরু হয়ছিল। ওই সময় প্রায় একশজনের মতো উপস্থিত ছিলেন। আমার ভাইভা শেষ হতে হতে রাত ৯টার বেশি বেজে গেছিল।’
সার্কুলারের আগে কীভাবে ভাইভা দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২৭ জানুয়ারি আমাকে ডেকেছিল তাই গিয়েছিলাম। পরবর্তীতে আবার সার্কুলার হয়েছে, পরে আবার আবেদন করেছিলাম। কিন্তু এরপর আর ডাকেনি। ভাইভা বোর্ডে কারা ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইখানে যারা ভাইভা নিয়েছেন আমি তাদেরকে চিনি না। আমাকে প্রার্থী হিসেবে ডাকা হয়েছিল, আমি পরীক্ষা দিয়েছি।’
মৌখিক পরীক্ষায় কি জিজ্ঞেসা করেছিল জানতে চাইলে ফারুক বলেন, ‘জুলাই সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছে। এর আগে কাজের কোনো দক্ষতা কিনা জানতে চেয়েছে। জুলাইকে কি ভূমিকা ছিল জানতে চেয়েছে।’
সিসি ক্যামেরার ফুটেজে উঠে আসা অফিস শেষ হওয়ার পরবর্তী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অডিটরিয়াম সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চায় এশিয়া পোস্ট। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার মনে নেই, তারিখ না দেখে বলতে পারব না।’ তবে পরে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘কয়েকদিন অফিস টাইমের পরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তবে কিসের সাক্ষাৎকার সেটা বলতে পারব না। যেহেতু অডিটরিয়ামের দায়িত্বে রয়েছি তাই আমার থাকতে হয়েছে। কিন্তু কিসের সাক্ষাৎকার সেটা স্যারেরা বলতে পারবেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জুলাই জাদুঘরের প্রধান কিউরেটর তানজিম ইবনে ওয়াহাব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। এর আগে কিছু স্বেচ্ছাসেবককে গাইড করার একটি বিষয় ছিল। তবে তার সঙ্গে নিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই। এখন পর্যন্ত কোনো অনিয়ম হয়নি। নির্দিষ্ট নিয়োগ কমিটি আছে। অভিযোগ অসত্য।’
নিয়োগ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে
জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগের নেপথ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবের পছন্দের কর্মকর্তা জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন জাতীয় জাদুঘরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। পুরস্কারস্বরূপ তাদের সুবিধাজনক জায়গায় পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি পদোন্নতির জন্য অনেকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. সাদেকুল ইসলাম। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিয়োগের জন্য সাত সদস্যের নিয়োগ কমিটি আছে। তারাই এ সংক্রান্ত বিষয় দেখে। আর্থিক লেনদেনের খবর অসত্য।’ সুত্র: এশিয়া পোস্ট
কপিরাইট © ২০২৬ চেক পোস্ট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত