যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে যখন তোলপাড় চলছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে নতুন এক সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি ও ওয়ার্ক ভিসা নিয়ে গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে আসা হাজার হাজার অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের (আইএলআর) ভাগ্য নিয়ে এখন ওয়েস্টমিনিস্টারের অন্দরমহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
হোম অফিস জনসমক্ষে আইএলআর-এর সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার পরিকল্পনা বজায় রাখলেও, সরকারের ভেতর থেকেই একটি ‘মধ্যপন্থা’ অবলম্বনের চাপ বাড়ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যারা ইতোমধ্যে ব্রিটেনে এসে অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কিছুটা পিছু হটতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশার খবর হলো প্রস্তাবিত আইনের ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’ বা অতীত কার্যকারিতার দিকটি। প্রাথমিক পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল যে, যারা বর্তমানে ৫ বছরের রুটে স্থায়ী হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ১০ বছরের নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। তবে সরকারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ আলোচনা অনুযায়ী একটি ‘গ্র্যান্ডফাদার ক্লজ’ বা বিশেষ ছাড় যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর মানে হতে পারে, ২০২৬ সালের আগে যারা স্কিলড ওয়ার্কার বা হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ভিসা নিয়ে ব্রিটেনে এসেছেন, তাদের জন্য আগের ৫ বছরের নিয়মই বহাল থাকবে। শুধু ২০২৬ সালের পরের নতুন আবেদনকারীদের জন্য ১০ বছরের শর্ত প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের এই সম্ভাব্য পিছু হটার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন লেবার পার্টির ব্যাকবেঞ্চ এমপি এবং মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য। তাদের মতে, মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন করা অত্যন্ত অন্যায্য। একজন এমপি বলেন, যারা ইতোমধ্যে জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন এবং এনএইচএস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সেবা দিচ্ছেন, তাদের জন্য মাঝপথে গোলপোস্ট পরিবর্তন করা যায় না।
বর্তমান ওয়ার্ক ভিসা ধারীদের জন্য আরও একটি ইতিবাচক খবর হলো, সরকার গ্রিন এনার্জি বা স্পেশালিস্ট হেলথকেয়ারের মতো উচ্চ-মূল্যের খাতগুলোর জন্য বিশেষ ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ ব্যবস্থা রাখার কথা ভাবছে। এতে দক্ষ কর্মীরা ১০ বছরের সাধারণ নিয়মের তোয়াক্কা না করেই দ্রুত স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে এই পুরো বিষয়টি এখনও বেশ সংবেদনশীল। কয়েকজন সংসদ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, সংসদীয় ভোট ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা। ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দীন সুমন বলেন, হোম অফিস বর্তমানে প্রায় ২ লাখ মানুষের মতামত যাচাই করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে একটি ‘টু-টিয়ার সেটলমেন্ট সিস্টেম’ বা দ্বি-স্তরীয় ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
এদিকে ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ এই অভিবাসন নীতি নিয়ে বিভক্ত। সাধারণ মানুষের মনোভাব তুলে ধরে ক্রিস চ্যাডউইক বলেন, এমপিরা দেশের মানুষের মনের ভাষা বোঝেন না। তারা হয়তো ভাবছেন নির্বাচনের সময় মানুষ সব ভুলে যাবে, কিন্তু ব্রিটিশদের স্মৃতিশক্তি অনেক প্রখর।
কঠোর নতুন নিয়ম বনাম দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা, এই দুইয়ের দোলাচলেই এখন ব্রিটেনের অভিবাসন রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। বর্তমানে পরামর্শ পর্ব শেষে সরকারের চূড়ান্ত ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে ব্রিটেনের লাখো অভিবাসী পরিবার।