
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবন এক সময় জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছিল। অপহরণ, ডাকাতি ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালি এমনকি পর্যটকরাও ছিলেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও প্রায় সাত বছর পর আবারও নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ১৪–১৫টি জলদস্যু বাহিনী।
বর্তমানে এসব বাহিনী বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে ‘দুলাভাই বাহিনী’, যারা আবারও দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দুলাভাই বাহিনীর এক সদস্য আক্কাস আলী (ছদ্মনাম) জানান, ২০১৮ সালে তিনি ছোট রাজু বাহিনীর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু আত্মসমর্পণের পর একটি হত্যা মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয় এবং আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হন। জামিনে মুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন তিনি।
তার ভাষায়, “দস্যু জীবন কোনো জীবন না। আমরা স্বাভাবিক জীবন চাই। কিন্তু মিথ্যা মামলা আর হয়রানির কারণেই আবার অন্ধকার পথে ফিরতে হয়েছে।”
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দুলাভাই বাহিনী ফের সক্রিয় হলে মানসিক ক্ষোভ থেকেই তিনি আবার তাদের সঙ্গে যুক্ত হন বলে দাবি করেন।
বাহিনীর আরেক সদস্য রহিম উদ্দিন (ছদ্মনাম) বলেন, ২০০৯ সালের একটি হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হওয়ায় তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে দুলাভাই বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন। তার দাবি, “মিথ্যা মামলা ও হয়রানির ক্ষোভ থেকেই এই পথে আসা।”
দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দা। একসময় তিনি বনজীবী ছিলেন। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাকে বারবার মিথ্যা মামলায় জড়িয়েছেন। এমনকি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে ক্ষোভ থেকেই তিনি দুলাভাই বাহিনী গড়ে তোলেন বলে দাবি করেন। তবে তার বক্তব্য, “আমরা অন্য দস্যুদের মতো বনজীবীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করি না। মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি পেলে সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই।”
র্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহম্মেদ বলেন, “জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করতে চাইলে আমরা সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখি। সুন্দরবনে দস্যুতা আমরা চাই না। তারা যদি আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়, আমরা প্রস্তুত। তবে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন একটি আইনগত প্রক্রিয়া, এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।”