এক-এগারোর পটভূমি এবং সেই সময় পর্দার আড়ালে সক্রিয় থাকা কুশীলবদের ভূমিকা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ডিবির হেফাজতে থাকা দুই অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এই তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন সময়ে প্রভাব বিস্তারকারী উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির তালিকা তৈরি করে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ইউনিট।
রোববার (২৯ মার্চ) ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালের সেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন এবং চাকরিচ্যুত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীসহ তৎকালীন শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার নাম এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে হটিয়ে সেনাসমর্থিত নতুন সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। ঘটনার দিন রাষ্ট্রপতির বাসভবনে একটি বিশেষ চা-চক্রে তাকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। সেখানেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ডিবির কাছে দাবি করেছেন, ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত করার আগেই দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীকে তা অবহিত করা হয়েছিল। ওই সময় সরকারের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎকালীন প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের খসড়াও তাদের দপ্তর থেকেই নির্ধারিত হতো।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সূত্রে আরও জানা যায়, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের তালিকা মূলত সেনাকর্মকর্তারাই চূড়ান্ত করতেন। এমনকি খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের আগে বিষয়টি দুটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রকে অবহিত করা হয়েছিল। তাদের সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে রাখার সিদ্ধান্তটিও ছিল সেনা কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শে।
জিজ্ঞাসাবাদে আরও তথ্য মিলেছে, দুই নেত্রী কারাগারে বন্দি থাকার সময় তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নির্বাচন নিয়ে পর্দার আড়ালে যে দর-কষাকষি চলত, তাতে ডিজিএফআই কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত কারাগারে গিয়ে বন্দি নেত্রীদের সঙ্গে গোপন বৈঠকও করতেন।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময়কালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টারের (এনএমসি) অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ছিলেন। ২০০৮ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) অধীনে গড়ে ওঠা মোবাইল ফোনে আড়িপাতার ব্যবস্থার মাস্টারমাইন্ড বলা হয় তাকে। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতাদের গুমের সাথে সম্পৃক্ততা এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প সংক্রান্ত বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে।
উল্লেখ্য, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত ২৩ মার্চ রাতে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে এবং শেখ মামুন খালেদকে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পৃথক মামলায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের দেওয়া তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।