‘‘অভিভাবকদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে হাম একটি দ্রুত সংক্রামক রোগ যা থেকে শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই মূল উপায়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে আপনারা সচেতন থাকুন।’’
সরকার গঠনের মাত্র ৪৫ দিন অর্থাৎ দেড় মাসের মাথায় বাংলাদেশে নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে চরম চাপ ও সংকটে পড়েছে। অর্থনৈতিক চাপ, ডলার ও আমদানি সংকট, পণ্যের চড়া দাম, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চাপ (হামের প্রাদুর্ভাব), চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গুজব ও আস্থার সংকট, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ, বিরোধী দলের আন্দোলন, এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা নতুন সরকারকে গভীর ও ব্যাপক চাপে ফেলেছে।
তবে, সবচেয়ে তীব্রভাবে চাপে ফেলেছে আমেরিকার-ইজরায়েল যৌথভাবে পারস্য উপসাগরীয় দেশ ইরানের ওপর হামলা ও যুদ্ধ শুরুর কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুল সংখ্যক শিশুর অকাল মৃত্যুতে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হয়। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘ ১৮ মাস (৫৫৮ দিন) দায়িত্ব পালনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের মেয়াদ শেষ করে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ শুক্রবার (৩ এপ্রিল) পর্যন্ত মোট ৪৬ দিন অতিক্রান্ত হলেও শপথের দিন বাদ দিলে কার্যকরভাবে আজ সরকারের ৪৫তম দিন পূর্ণ হয়েছে। নতুন এই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জানা গেছে, সরকারে এসেই নতুন সরকার বেশ কয়েকটি ইস্যুতে তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। এরমধ্যে অর্থনৈতিক চাপ (জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি), ডলার ও আমদানি সংকট: তেলের আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধির বিপরীতে ডলারের অভাবে এলসি (LC) খুলতে না পারা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। এটি তেলের সরবরাহ চেইনকে ভেঙে দিতে পারে বলে সরকারের মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, পণ্যের চড়া দাম অন্যতম কারণ। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেবে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কারও রয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হলে রপ্তানি আয় কমে যাবে এবং বেকারত্ব বাড়বে, যা সরকারকে কঠিন চাপে ফেলে দেবে।
পাশাপাশি নতুন করে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক চাপ (হামের প্রাদুর্ভাব) সরকারকে ভাবাচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় হাসপাতালে শয্যা ও আইসিইউ সংকট মোকাবিলা করা এবং দ্রুত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুদের মৃত্যু বাড়তে থাকলে সরকারের ওপর নৈতিক চাপ ও সমালোচনার ঝড় উঠবে। গুজব ও আস্থার সংকটও রয়েছে বলে সরকার মনে করছে। টিকাদান কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অপপ্রচার বন্ধ করা সরকারের জন্য একটি কঠিন কাজ। এর বাইরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ রয়েছে। বিরোধী দলের আন্দোলন, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনাকে ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলনে নামতে পারে, যা নতুন সরকারের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করবে।
প্রশাসনিক স্থবিরতা
তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও কালোবাজারি রুখতে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখা সরকারের জন্য বড় এক পরীক্ষা। এই বহুমুখী সংকট সামাল দিতে সরকার বর্তমানে বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং জরুরি স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দের ওপর জোর দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতার কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট এবং অন্যদিকে দেশজুড়ে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব সরকারকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে।
জ্বালানি সংকট ও তেলের পাম্পে দীর্ঘ সারি
২০২৬ সালের এপ্রিলের এই তপ্ত দুপুরে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এক অভূতপূর্ব রূপ নিয়েছে। শহরের মোড়ে মোড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে এখন গাড়ির দীর্ঘ সারি মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে গেছে। দৃশ্যটি কেবল যানজটের নয় বরং এক গভীর হাহাকারের।
রাজধানীর তেজগাঁও বা কল্যাণপুরের পাম্পগুলোতে মধ্যরাত থেকেই ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভিড় জমে। চালকরা স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে ঝিমোচ্ছেন, কারণ পাম্পে তেল নেই। গত কয়েকদিন ধরে সরকার জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে; একেকটি পাম্পকে দিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। খুচরা বাজারে বোতলজাত অকটেন বা পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলছে।
সংকট কতটা প্রকট, তা বোঝা যায় সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কঠোর সিদ্ধান্তে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ইতোমধ্যে সারাদেশে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ এবং সপ্তাহে একদিন এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি স্কুল-কলেজের সময়সূচী পরিবর্তন এবং অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাসে ফেরার চিন্তাও চলছে। ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বোরো চাষিরা দিশেহারা, যার প্রভাব সরাসরি চালের বাজারে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি আর ডলার সংকটে সময়মতো এলসি (LC) খুলতে না পারায় মজুত তলানিতে ঠেকেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এখন ডিজিটাল ফুয়েল পাস বা কিউআর কোড সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে, যাতে একজন গ্রাহক সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল কিনতে না পারেন।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সংকট কেবল গাড়ির চাকা নয়, দেশের অর্থনীতির চাকাও শ্লথ করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—এই দীর্ঘ সারি আর কতদিন?
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। যার কারণে সরবরাহ ঘাটতি জনিত কারণে সরকার জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিজিটাল 'ফুয়েল পাস' (QR Code) চালুর পরিকল্পনা করছে এবং তেলের মজুতদারি ঠেকাতে সারাদেশে অভিযান চালাচ্ছে। তেলের মজুতদারি ও কালোবাজারি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যেই ‘ট্যাগ’ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। জ্বালানি তেলকে কেন্দ্র করে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত নানা অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটছে। মারামারি, দাঙ্গায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মারাও গিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ এসেছে।
এদিকে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখেও জনসমর্থন ধরে রাখতে এবং জনগণের আস্থায় থাকতে সরকার ও সরকার প্রধান তারেক রহমান এখনও পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির দাবি ও প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার এপ্রিল মাসেও তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিকল্প উৎসের সন্ধান
আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার এখন সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ থেকে বিকল্প রুটে তেল আনার চেষ্টা করছে।
১. পাম্পে হাহাকার ও রেশনিং: দেশের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে এখন ডিজেল ও অকটেনের তীব্র সংকট। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে 'ফুয়েল পাস' (Fuel Pass) বা কিউআর কোড সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সপ্তাহে ২০ লিটার এবং মোটরসাইকেলের জন্য মাত্র ৫ লিটার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে।
২. পরিবহন ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: তেলের অভাবে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বাজারে সবজি থেকে শুরু করে চাল-ডালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।
৩. বিদ্যুৎ ও সেচ সংকট: ডিজেলের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, ফলে দিনে ৫-৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে কৃষিতে; বোরো মৌসুমের সেচ পাম্পগুলো চালাতে না পেরে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
৪. ডলার ও আমদানি জটিলতা: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে সময়মতো এলসি (LC) খোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং নতুন করে আমদানিতে দেরি হচ্ছে।
৫. জরুরি ব্যবস্থা: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ইতোমধ্যে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অফিসের সময় কমিয়ে আনার কথা ভাবছে। এমনকি অনেক এলাকায় বিশৃঙ্খলা এড়াতে পাম্পগুলোতে বিজিবি (BGB) মোতায়েন করতে হয়েছে।
সরকার এখন বিকল্প হিসেবে রাশিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে সরাসরি তেল আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে।
হামের প্রাদুর্ভাব ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট
দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা এবং ২০২৪-২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩৮ থেকে ৫০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেড়েছে। ঢাকা ও রাজশাহীসহ দেশের প্রায় ৫৬টি জেলায় এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে বিশেষ করে আইসিইউ (ICU) ও ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সরকারের পদক্ষেপ
জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনার জন্য সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।
প্রশাসনিক ও সামাজিক চাপ
জ্বালানি ও হাম; এই দুই সংকটের কারণে সরকার প্রশাসনিকভাবে বেশ চাপের মুখে রয়েছে। নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও মজুতদারি রুখতে সারাদেশে বিজিবি (BGB) মোতায়েন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে টিকার ঘাটতি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার কারণে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, যা সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকার বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয় করতে অফিস সময় কমানো বা অনলাইন ক্লাসের মতো বিকল্প পরিকল্পনাগুলো নিয়েও চিন্তা-ভাবনার পর আজ ৩ এপ্রিল শুক্রবার থেকে তা কার্যকর করেছে।
এদিকে, জ্বালানি বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল (২ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সর্বশেষ বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন যে, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই বরং 'প্যানিক বায়িং' বা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কেনার প্রবণতাই দীর্ঘ সারির মূল কারণ।
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি পাম্পগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে জনগণের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, যা থেকে 'প্যানিক বায়িং' শুরু হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আগে যে পাম্পের মজুত তেল বিক্রি হতে দেড় দিন লাগত, এখন সেটি দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি মোটরসাইকেল যেখানে সাধারণত ৫ লিটার তেল নেয়, সেখানে অনেকে দিনে কয়েকবার এসে ১৫ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত সংগ্রহ করছেন। এই অতিরিক্ত মজুত প্রবণতাই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অপরদিকে, ২০২৬ সালের চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর সঠিক সংখ্যাটি নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান জানা যায়। তবে অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এই সংখ্যা ৩৮ থেকে ৫২ জনের মধ্যে।
তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) অন্তত ৩৮ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার ২ এপ্রিল সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এই সংখ্যা বেড়ে ৪২ থেকে ৫২ জনে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্চ মাসের ভয়াবহতা
মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশ অর্থাৎ অন্তত ৩২ জন শিশু শুধু মার্চ মাসেই মারা গেছে। এরমধ্যে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২১-২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে মারা গেছে ৬ জন শিশু। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন শিশুর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যান্য জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন, চাঁদপুরে ৩ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশু মারা গেছে।
ল্যাবরেটরি নিশ্চিত মৃত্যু
সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্যমতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সহায়তায় নমুনা পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে, বাকিদের মৃত্যু হয়েছে হাম পরবর্তী জটিলতায় (যেমন নিউমোনিয়া)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর তথ্য দেরিতে পৌঁছানো বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার অভাবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি (সম্ভবত ৪৬ বা তারও বেশি) হতে পারে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) হাম ও হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে আজ ৩ এপ্রিল শুক্রবার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ থেকে এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৬ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাসের দেওয়া তথ্যমতে, ২৯ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে ৬ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ মৃত্যুটি হয়েছে আজ ৩ এপ্রিল শুক্রবার সকালে।
এর আগে গত ৩০ মার্চ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন জানিয়েছিলেন যে, চলতি বছরে (জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত) মোট ৩০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অন্য একটি সূত্র বা গণমাধ্যম সেই সময়ে এই সংখ্যাটি ১২ জন বলে উল্লেখ করেছিল।
যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, উপসর্গ নিয়ে অনেক শিশুর মৃত্যু হলেও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ জন শিশুর মৃত্যু সরাসরি হামের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হাম পরবর্তী জটিলতা (যেমন তীব্র নিউমোনিয়া) বা অন্য কোনো সংক্রমণকে দায়ী করা হচ্ছে।
হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে রামেক হাসপাতালে প্রায় ১৩০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। রোগীর চাপ সামলাতে শিশু আইসিইউ (ICU) বেড সংখ্যা বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টিই হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ
হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর বর্তমান পরিস্থিতি সারাদেশে অভিভাবকদের মধ্যে একটি আতঙ্কজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ শিশুদের ভিড় এবং আইসিইউ-র জন্য হাহাকার এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অভিভাবকদের এই চরম উদ্বেগের মূল কারণগুলো হলো: টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। অনেক অভিভাবক দাবি করছেন যে তাদের সন্তানকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) আওতায় হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল, তবুও তারা আক্রান্ত হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টি বা অন্য কোনো কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এমনটি হতে পারে।
হাসপাতালে শয্যা সংকট
আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা এত বেশি যে হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিশেষ করে আইসিইউ (ICU) ও ভেন্টিলেটরের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা অভিভাবকদের দিশেহারা করে তুলেছে।
দ্রুত অবনতি
হামের সাধারণ লক্ষণের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে দ্রুত নিউমোনিয়া, মস্তিস্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গুজব ও বিভ্রান্তি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ভুল চিকিৎসা নিয়ে নানা গুজব ছড়ানোর ফলে অনেক অভিভাবক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের জন্য ৯ মাস এবং ১৫ মাস পূর্ণ হওয়া শিশুদের অবশ্যই হাম-রুবেলা (MR) টিকা নিশ্চিত করার জরুরি পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
জ্বর বা শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং প্রচুর তরল খাবার দেওয়ার কথা জানানো হচ্ছে। সরকার বর্তমানে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দেশব্যাপী বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে।
এদিকে, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর অধীনস্থ সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালক (প্রশাসন) ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয় যে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এটি জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ ধরণের রোগের বা দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রধান ভূমিকাতো আসলে সরকারের। সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার জায়গা থেকে হামের প্রাদুর্ভাব নির্মূলে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে, আপনার প্রশ্নের জবাবে আমি বলছি-দল হিসেবে যেহেতু আমি বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, সেই দায়িত্ব থেকে এবং নিজের আগ্রহের জায়গা থেকে আমি কিন্তু শিশু মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহীতে ছুটে গিয়েছি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভিজিট করেছি। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরামর্শ করেছি, কীভাবে এই দুর্যোগ থেকে আমরা রেহাই পেতে পারি।
তিনি বলেন, আমাকে সেখানকার বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিসক জানিয়েছেন, যে ১৮জন শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে মাত্র ১ জনের মধ্যে হামের লক্ষণ ছিল। বাকী শিশুদের মৃত্যুর কারণ মূলত নিউমনিয়াজনিত। আর সেখানে আইসিও ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকার কারণও অন্যতম কারণ হিসেবে জানা গেছে। এ সব বিষয়ে আমি আপনাদের সামনে বক্তব্য দিয়েছি।
ডা. রফিক বলেন, হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, হামের কারণে শিশু মৃত্যুর কারণে দেশে অভিভাবকদের মধ্যে একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। দেশের আটটি অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আমি আপনার/আপনাদের মাধ্যমে জনগণকে বলব, আপনারা আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্কিত হওয়া সমস্যার সমাধান না। কীভাবে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব থেকে রেহাই পেতে পারি, আমাদের প্রচেষ্টা সেই সমাধানের দিকে থাকতে হবে। আতঙ্কিত হলে সমস্যার সমাধান হবে না। তবে, একথাও ঠিক, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকবেই।
তিনি বলেন, কোনো শিশুর হাম হলে আতঙ্কিত না হয়ে, হামের লক্ষণ ধরা পড়লে তাকে যেন দ্রুত আইসোলেশন করা হয়। দেখা গেছে যে, একজন আক্রান্ত হলে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৮জন আক্রান্ত হয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব আইসোলেশন করতে হবে। তার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে আরও বলেন, যে বিগত সরকারের মেয়াদকালে সময়মতো হামের টিকা ব্যবস্থা করা হয়নি। আপনি জানেন, গতকালও (২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার) আমরা হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয় নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করেছি। সেখানে দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা ছিলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ছিলেন। আমরা কিন্তু করণীয় কি সেই লক্ষ্যে সরকারকে অবহিত করেছি। সরকারও পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকারের পদক্ষেপ ও জনগণের সচেতনায় অবশ্যই আমরা হামের এই প্রাদুর্ভাব থেকে খুব দ্রুত রেহাই পাব বলে আমি আশাবাদী।
‘‘অভিভাবকদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে হাম একটি দ্রুত সংক্রামক রোগ যা থেকে শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। হামের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই মূল উপায়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে আপনারা সচেতন থাকুন।’’