ঢাকা ০৯:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

রাতের আঁধারে রসুনক্ষেতে তাণ্ডব: গুরুদাসপুরে কৃষকের একমাত্র আয়ের উৎস ধ্বংস

সুজন মাহমুদ, ক্রাইম রিপোর্টার::
83

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় রাতের আঁধারে এক কৃষকের রসুনক্ষেত কেটে নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের হাতে একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয়রা।

ঘটনাটি ঘটে সোমবার গভীর রাতে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের তুলাধুনা বিলে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম উপজেলার চন্দ্রপুর তুলাধুনা গ্রামের জাহের মোল্লার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের নিস্তব্ধতায় পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ৬ শতাংশ জমির রসুনের সব চারা কেটে ফেলা হয়।

মঙ্গলবার সকালে জমিতে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে পড়েন আরিফুল ইসলাম। সারি সারি রসুনের চারা মাটিতে লুটিয়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কৃষক পরিবার ও প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। মুহূর্তেই এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, এই ৬ শতাংশ জমির রসুনই ছিল আমার পরিবারের একমাত্র ভরসা। ধারদেনা করে চাষ করেছি। সোমবার রাতের আধারে দুর্বৃত্তরা হাসুয়া দিয়ে সব রসুন কেটে নষ্ট করে দিয়েছে। আমার কোনো শত্রু নেই, কেন এমন করলো বুঝতে পারছি না। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো, জানি না।

তিনি আরও জানান, রসুন চাষে তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই ফসল বিক্রি করেই সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তুলাধুনা বিল এলাকায় এর আগেও কয়েকটি ফসল নষ্টের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোনো ঘটনায় এখনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। ফলে দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “এভাবে যদি রাতের আঁধারে ফসল নষ্ট হয়, তাহলে কৃষকরা মাঠে নামবে কীভাবে? প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো দরকার। না হলে আমরা সবাই ঝুঁকিতে থাকবো।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, পূর্বশত্রুতা কিংবা জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই নাশকতা হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুজ্জামান সরকার বলেন, এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষক নেতারা। তারা বলেন, শুধু তদন্ত নয়, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের নাশকতা শুধু একজন কৃষককে নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। কৃষকের ফসল রক্ষায় মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমানে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় এই ঘটনায় তদন্ত কতটা দ্রুত এগোয় এবং অপরাধীরা আদৌ আইনের মুখোমুখি হয় কিনা।

ট্যাগস :

নিউজটি টাইম লাইনে শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চেকপোস্ট

Checkpost is one of the most popular Bengali news portal and print newspaper in Bangladesh. The print and online news portal started its operations with a commitment to fearless, investigative, informative and unbiased journalism.
আপডেট সময় ১২:১৬:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
৫৫০ বার পড়া হয়েছে

রাতের আঁধারে রসুনক্ষেতে তাণ্ডব: গুরুদাসপুরে কৃষকের একমাত্র আয়ের উৎস ধ্বংস

আপডেট সময় ১২:১৬:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
83

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় রাতের আঁধারে এক কৃষকের রসুনক্ষেত কেটে নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের হাতে একমাত্র আয়ের উৎস হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্থানীয়রা।

ঘটনাটি ঘটে সোমবার গভীর রাতে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের তুলাধুনা বিলে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম উপজেলার চন্দ্রপুর তুলাধুনা গ্রামের জাহের মোল্লার ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতের নিস্তব্ধতায় পরিকল্পিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ৬ শতাংশ জমির রসুনের সব চারা কেটে ফেলা হয়।

মঙ্গলবার সকালে জমিতে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে পড়েন আরিফুল ইসলাম। সারি সারি রসুনের চারা মাটিতে লুটিয়ে থাকতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কৃষক পরিবার ও প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। মুহূর্তেই এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম বলেন, এই ৬ শতাংশ জমির রসুনই ছিল আমার পরিবারের একমাত্র ভরসা। ধারদেনা করে চাষ করেছি। সোমবার রাতের আধারে দুর্বৃত্তরা হাসুয়া দিয়ে সব রসুন কেটে নষ্ট করে দিয়েছে। আমার কোনো শত্রু নেই, কেন এমন করলো বুঝতে পারছি না। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো, জানি না।

তিনি আরও জানান, রসুন চাষে তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই ফসল বিক্রি করেই সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তুলাধুনা বিল এলাকায় এর আগেও কয়েকটি ফসল নষ্টের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোনো ঘটনায় এখনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। ফলে দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “এভাবে যদি রাতের আঁধারে ফসল নষ্ট হয়, তাহলে কৃষকরা মাঠে নামবে কীভাবে? প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো দরকার। না হলে আমরা সবাই ঝুঁকিতে থাকবো।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে স্থানীয়দের ধারণা, পূর্বশত্রুতা কিংবা জমি সংক্রান্ত বিরোধ থেকেই এই নাশকতা হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুজ্জামান সরকার বলেন, এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষক নেতারা। তারা বলেন, শুধু তদন্ত নয়, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের নাশকতা শুধু একজন কৃষককে নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। কৃষকের ফসল রক্ষায় মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বর্তমানে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরিফুল ইসলাম প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় এই ঘটনায় তদন্ত কতটা দ্রুত এগোয় এবং অপরাধীরা আদৌ আইনের মুখোমুখি হয় কিনা।